আমার স্পাইডারম্যান হওয়ার গল্প…..

21 জানু

yousufkhan007_1354210812_1-reeee

ভার্সিটির পড়া শেষ হতে আরও মাস ছয়েক বাকি, ওদিকে বাবা মা’র চিল্লানিতে ঘরে থাকা দায়। সমবয়সী চাচাতো ভাইয়েরা সবাই পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু করে। কেবল আমিই কিছু করিনা। সারাদিন ঘরে বসে মুভি দেখা আর ফেইবুকিং করাও যে একটা বিরাট কাজ, এই কথা তাদেরকে কে বোঝাবে?

যাই হোক, জীবনটা মাঝে মাঝে বেশ অতিস্ট লাগে। সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় বাব মা’র চিল্লানি, থামে রাত ১২টায়। কতোদিন আর এভাবে থাকা যায়?
একদিন চিন্তা করলাম, বাসা থেকে বেরিয়ে যাবো। বেরিয়ে গেলাম। সারাদিন এক বন্ধুর বাসায় কাটিয়ে সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে গিয়ে বসে রইলাম। ঠিক করলাম, আর কখনো ফিরবোনা বাসায়। বাবা- মা বুঝুক, আমি না থাকলে তাদের কেমন লাগে। রাত ৯টা পর্যন্ত বসে রইলাম নদীর পাড়ে। ১০টার দিকে এমন খিদে পেলো যে, শরীর কাঁপতে শুরু করলো। জোর করে আরও মিনিট দশেক থাকার পর আর পারলাম না। বাধ্য ছেলের মতো বাসায় ফিরে গেলাম। এভাবে প্রায় ৬ বার বাসা ছেড়েছি তবে, কোনটার স্থায়িত্বই রাত ১০টার বেশী হয়নি।

পরদিনের কথা। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গেছি। বাথরুমে ঢুকেই প্রচণ্ড ভয়ে ছিটকে বেরিয়ে এলাম। বেসিনের ঠিক পাশে বিকট দর্শন এক মাকড়সা। বিশাল সাইজ। গায়ের রঙটাও কেমন আজব। নীলচে আর বাদামী, মাথার দিকে কালো। ঢাকা শহরের বাথরুমের ভিতরে এরকম মাকড়সা দেখবো- কখনও কল্পনাও করিনি। এগুলো শুধুমাত্র ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলেই মানায়। এখানে কোত্থেকে এলো কিছুই বুঝলাম না।
সাত- পাঁচ না ভেবে স্যান্ডেলটা উঁচিয়ে সামনে গেলাম মারার জন্য। মানুষ হিসেবে আমি বেশ ভীতু। কখনো একটা তেলাপোকাও মারিনি। আতঙ্ক নিয়ে বেড়িয়ে গেলাম। ঢুকলাম বাবা মা’র বাথরুমে।

দুপুরে একটা জরুরী কাজে বাইরে যেতে হবে। তাড়াহুড়ো করে বাথরুমে ঢুকেই আতঙ্কে বেড়িয়ে গেলাম। মাকড়সাটার কথা মনেই ছিলো না। ব্যাটা তখনো সেই একই জায়গায় সেঁটে আছে। নড়ার নামগন্ধও নেই। ভাবলাম, ধুর- যা হয় হবে। ভয়ে ভয়েই গোসল সারলাম। গোসলের মাঝে হঠাৎ মাথায় একটা আজব চিন্তা উঁকি দিলো। আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে- এটা অন্য কোন প্রজাতির মাকড়সা! বিজ্ঞানীরা যে প্রজাতির ব্যাপারে এখনো কিছু জানে না! গায়ের রঙটাও কেমন অদ্ভুত। জীবনে অনেক মাকড়সা দেখেছি কিন্তু, এরকম আজব কালারের মাকরসা আজ পর্যন্ত দেখিনি। ছোটবেলার সেই ভয়ানক ইচ্ছাটা হঠাৎ করে ধাক্কা দিলো মনে। এ ধরনের পাগলামিগুলো আমার মধ্যে বেশ প্রবল। যখন মনে আসে, কিছু না ভেবেই করে ফেলি। এখনো তাই হলো। আর, যা ভাবছি তা যদি নাও হয়, পরিক্ষা করে দেখতে দোষ কি? জীবনে তো কতো কিছুই করলাম, এটাও না হয় আরেকটা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম মাকড়সাটার দিকে। বুক ঢিপ ঢিপ করছে, জানিনা এর ফলাফল কি হবে। ভয় এবং আশার অভূতপূর্ব এক প্রতিক্রিয়া নিয়ে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলাম মাকড়সাটার সামনে। এক মিনিট চোখ বন্ধ করে রইলাম। এরপর আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখি মাকড়সাটা খানিকটা দূরে চলে গেছে। আবার হাত বাড়িয়ে দিলাম, আবার সে দূরে সরে গেলো। মিনিট পাঁচেক এরকমভাবে চলার পর মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। শেষমেশ সব ভয় উপেক্ষা করে মাকড়সাটা জোর করে ধরে ডান হাতের উপর বসিয়ে দিলাম। বেশ কিছুক্ষন উত্যাক্ত করার পর এক পর্যায়ে সে বুঝলো- আমি কি চাই। কামড় বসিয়ে দিলো আমার ডান হাতে। সাথে সাথে আমার পাগলামি কেটে গেলো। প্রচণ্ড জোরে দূরে ছুঁড়ে দিলাম মাকড়সাটাকে। এরপর ভয়ে আর আতঙ্কে বাথরুম থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে গেলাম।

যাক, প্রথম ধাপ কমপ্লিট। এখন শুধু অপেক্ষার পালা। আমার সেই ছোটবেলার স্বপ্ন। এভাবে পূরণ হবে- কখনো কল্পনাও করিনি। যা ভাবছি, একবার হতে পারলেই আর পায় কে? চাকরী, ব্যাবসা সব আমার হাতের মুঠোয় চলে আসবে। বাবা- মার চিল্লাচিল্লিও আর সহ্য করতে হবেনা।
যাই হোক, রেডি হয়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেলাম। চশমা ছাড়া আমি এক কদমও চলতে পারিনা। তারপরও, কি ভেবে যেন আজ চশমাটা নিলাম না। আমি জানি, এখন আমি চশমা ছাড়াই দেখতে পাবো। ভার্সিটিতে যাওয়ার কথা না থাকলেও ভার্সিটির দিকেই রওনা দিলাম। মনে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা।

বেরিয়েই বুঝতে পারলাম, ভুল হয়েছে। রিক্সার প্রচণ্ড ধাক্কায় ছিটকে পড়ে গেলাম পাশের ড্রেনে। আমি কিছু বলার আগেই রিক্সাওয়ালা আমাকে কানা- লুলা জাতীয় কিছু একটা বলতে বলতে টেনে চলে গেলো। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষন বসে রইলাম। এরপর আস্তে আস্তে উঠে আবার বাসার দিকে গেলাম। কাপর সব ময়লা হয়ে গেছে, চেঞ্জ করতে হবে। চশমাটাও নিতে হবে।
ভার্সিটি যেয়ে ক্লাসে ঢুকলাম না। সরাসরি চলে গেলাম ক্যান্টিনে। কোনার এক টেবিলে যেয়ে বসলাম। পাশের টেবিলে দেখলাম ক্লাসের সবচেয়ে ফাঁতরা ছেলে সবুজ (ফেইসবুকে যেটা হয়ে গেছে- শুভজ) তার বান্ধবীদের নিয়ে বসে আছে। সবার পরনে যথারীতি সন্ন্যাসী মার্কা ড্রেস। আমি সুযোগ খুজতে লাগলাম কিভাবে ঝগড়া বাঁধানো যায় ব্যাটার সাথে। অন্যান্য সময় আমাকে দেখলেই ও দূর থেকে আজেবাজে বুলি ছোড়ে। বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করার চেষ্টা করে আমাকে কিন্তু, আজ আমার দিকে তাকাচ্ছেই না।

ব্যাপার বুঝলাম না। আমি জানি এই মুহূর্তে আমার শরীরে অন্যরকম এক শক্তি খেলা করছে, আজ কিছু বললেই ব্যাটাকে ইচ্ছামতো ধোলাই দেবো, দেখিয়ে দেবো অস্বাভাবিক শক্তি। কিন্তু আজকে সেরকম কোন লক্ষণই সে দেখাচ্ছে না। মেজাজটা বিগড়ে গেলো।
উঠে দাঁড়ালাম। এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সবুজের টেবিলের দিকে। কাছে গিয়ে দাড়াতে সবুজ খানিকটা অবাক হয়ে তাকালো আমার দিকে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিয়ে কিছু বলার উদ্দেশ্যে মুখ খুললো।
মুখটা খোলার সাথে সাথেই ‘ধুম’ করে ঘুশি মেরে বসলাম।

সবুজ নাক ধরে বসে পরলো। পাশে বসে থাকা মেয়েগুলো প্রচণ্ড অবাক দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। আমাকে তখন পায় কে? আজকে তারা বুঝবে, এই ক্যাম্পাসে সবুঝ একাই হিরো না। আশে- পাশের টেবিলগুলো সরিয়ে জায়গা করলাম মারামারি করার সুবিধার্থে। সবুজ ততোক্ষণে চেহারা লাল করে উঠে দাঁড়িয়েছে। আমি চড়া গলায় বললাম, আজকে আমার বদলা নেয়ার সময়। আয় হয়ে যাক ‘ম্যান টু ম্যান ফাইট’।
ম্যান টু ম্যান ফাইটের পুরো প্রস্তুতি নিয়ে দাড়িয়ে থাকলেও সবুজ এগিয়ে এলো না। রুমালে নাক মুছে চাপা হাসি হাসলো। হঠাৎ দেখলাম, পিছন থেকে ওর পুরো চামচা বাহিনী এসে আমাকে ঘিরে ফেললো। উপায় না দেখে চোখ বুজে হাত- পা ছুড়তে শুরু করলাম, যেন কেউ সামনে আসতে না পারে। লাভ হলো না। সবাই একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার উপর। ম্যাট্রিক্স রেভোলুশন কায়দায় সবাইকে এক ঝটকায় উড়িয়ে দেয়ার অনেক চেষ্টা করলাম। বিন্দুমাত্র কাজ হলো না।

বিকালে ফিরে এলাম বাসায়। ভাগ্য ভালো বাসায় বাবা- মা কেউ ছিলো না। থাকলে আমার ছেঁড়া শার্ট আর চোখ- মুখের অস্বাভাবিক ফুলে ওঠা দেখে বোঝার কিছু বাকি থাকতো না। কিন্তু আমার ছোট ভাই ফাহিম দেখে ফেললো। আমার এই অবস্থা কেন- জিজ্ঞেস করাতে বেশ জোরে ধমক দিলাম। ও কথা না বাড়িয়ে মুখ টিপে হেঁসে ভিতরে চলে গেলো। বয়স ১২ হলেও ব্যাটা এখনই অনেক কিছু বোঝে।
রাতে গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো। মনে হলো, মাকড়সার কামড়ের আসল কাজ এখন শুরু হচ্ছে। একদিন অপেক্ষা করেই অ্যাকশনে নামা উচিত ছিলো আসলে। তাহলে আজকে আর মার খেতে হতো না। যাই হোক, বুক ভরা আশা নিয়ে ঘুম দিলাম।

সকালে ঘুম ভাঙ্গতে বুঝলাম, জ্বর নেই তবে শরীরে সামান্য ব্যাথা আছে। মারের কারনেই হয়তো। আয়নার সামনে যেয়ে দেখলাম স্বাস্থ্যের কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা। বেশ অবাক হয়ে দেখলাম, আমূল পরিবর্তন হবার কথা থাকলেও সেটা হয়নি। কোন পরিবর্তনই নেই। চোখ পড়লো বেসিনের পাশে। মাকড়সাটাও নেই। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতে দেখলাম, আমার ছোট ভাই ফাহিম হন্যে হয়ে ঘরের দেয়ালে কি যেনো খুঁজছে। হাতে ছোট একটা বোতল। বাথরুমেও গেলো খুঁজতে। আমি ঠাট্টা করে বললাম- কিরে, সকালবেলা বাথরুমে কি খুঁজছিস? নাস্তা করিস নাই?
ফাহিম নির্বিকার ভঙ্গীতে বললো, মাকড়সাটা খুজে পাচ্ছিনা। ওটার উপর আমার নতুন প্রাণনাশক ওষুধের একটা গবেষণা চালাচ্ছিলাম।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিসের ওষুধ? কিসের গবেষণা?
-ক্যান, তুমি জানোনা আমি বাথরুমে ওষুধ বানাই? কয়েকদিন আগে যখন প্রথম মাকড়সাটা দেখলাম বাথরুমে, তখন থেকেই ওষুধটা বানানো শুরু করে দিয়েছি। নতুন আইটেম হিসেবে এবার এতে যোগ করেছি কলমের কালি, সামান্য হারপিক, তোমার আফটার-শেভ, আর টুথপেস্ট। এবারেরটা বেশ পাওয়ারফুল হয়েছে। গতকাল একটা তেলাপোকার উপর ঢেলে দিয়েছিলাম। এক ঘণ্টার মাথায় মরে গেছে বেচারা। মাকড়সাটার উপরও একবার ঢেলেছি, ব্যাটা মরেনি। আরেকবার ঢালতে হবে মনে হচ্ছে।
ফাহিমের উত্তর শুনে বেশ কিছুক্ষন চুপচাপ বসে রইলাম। এরপর নাস্তা সেরে বেরিয়ে গেলাম ইমন ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। আমার ফুপাতো ভাই। ভালো জ্যাক আছে উনার। চাকরির ব্যাপারে আমাকে হেল্প করবে বলেছিলো।

ওই ঘটনার পর থেকে আর বাসায় অলস সময় কাঁটাইনি। বিভিন্ন জায়গায় চাকরী, ব্যাবসার জন্য দৌড়াদৌড়ি করেছি, এখনও করছি। কারন সেদিন আমি যা বুঝতে পেরেছিলাম তা হলো, কল্পনার জগৎ বেশ আরামদায়ক ও সহজ, সেটা সত্যি হয়ে কাছে এলেও আসলে সেটা ক্ষণিকের। আর, বাস্তবতা বেশ কঠিন হলেও সেখান থেকে বের করে আনা সুখটা চিরস্থায়ী।

-ঘটনা এখানেই শেষ হলে ভালো হতো তবে তা হয়নি। আমার এই আজব ঘটনাটা আমি কাউকে কক্ষনো বলিনি। শুধুমাত্র একজন ঘনিস্ট বন্ধু ছাড়া। একদিন ঘটনাক্রমে সে ও এই ঘটনাটা ফাঁস করে দিলো পুরো বন্ধু মহলের কাছে। আর এরপর থেকেই মূলত ওরা আমাকে আড়ালে ‘স্পাইডারম্যান’ বলে ডাকে।
শুনতে খারাপ লাগে না….

একটি প্রবাদ,ও আধুনিক প্রেমের গল্প……

1 ফেব্রু

yousufkhan007_1327427745_1-drowning-one-hand

 

প্রথমে একটা অন্যরকম ঘটনা দিয়ে শুরু করি-
বছরখানেক আগে, আমি এবং আমার তিন বন্ধু মিলে গিয়েছিলাম একটা নৌকা ভ্রমনে। গ্রামের বাড়ি নেই, তাই বুড়িগঙ্গার পচা পানির উপর নৌকা ভ্রমন করেই মনের শখ মিটাচ্ছিলাম। বেশ ভালয় ভালয় কাটলো পুরো ভ্রমন। সাতার কেউই তেমন জানতাম না তাই কিছুটা ভয়ের মধ্যে কাটলো। পাড়ের সামনে আমাদের নৌকাটা ভিড়বে, এমন সময় হঠাৎ বেশ বড় একটা ঢেউ এলো। ভয়ংকরভাবে দুলে উঠলো আমাদের নৌকা। ভয়ে আমার পেট মুচড়িয়ে উঠলো। মনে হচ্ছিলো- তীরে এসে তরী ডুববে। কলিজা গলায় এসে লাফাতে লাগলো। সবাই যার যার জায়গায় ষ্টীল হয়ে রইলাম। আমাদের ঘনিষ্ঠ দোস্ত সাব্বির, একটু বেশিই ভয় পেয়ে গেলো। সে আতঙ্কে উঠে দারালো। আমাদের নৌকার পাশ ঘেঁষেই তখন আরেকটা নৌকা যাচ্ছিলো। সাব্বির বাঁচার তাগিদে সেই নৌকাটার উপরে এক পা দিয়ে দিলো। আমরা চুপচাপ ওর কর্মকাণ্ড দেখতে লাগলাম। মাঝি বলল- “মামা, করেন কি? জায়গায় বসেন, কিচ্ছু হইবো না। নড়াচড়া করলে নৌকা উলটাইয়া যাইবো”
এদিকে সাব্বির দাঁড়ানোর ফলে আমাদের নৌকাটা এক পাশে বেশী ভারী হয়ে অনেকখানি কাত হয়ে গেলো।
ফলাফল- ঝপাং. ……..
সাব্বিরকে দেখলাম, পানিতে পড়ে গেলো। পাড়ের কাছে থাকায় ডুবলো না, তবে বুড়িগঙ্গার পচা পানিতে ভিজে একাকার হয়ে গেলো। আমাদের নৌকা সুন্দরমতো পাড়ে ভিরলো। আমরা আস্তে আস্তে নেমে গেলাম। আমাদের প্রচণ্ড হাঁসিতে কেপে উঠলো বুড়িগঙ্গার পাড়। অতি-রসিক মাঝিটা দূর থেকে বলতে লাগলো- ’মামা, দুই নৌকায় পা দিসেন, তো মরসেন’
সাব্বির দ্রুত হাটা ধরলো। আমরা পিছনে পিছনে।

“দুই নৌকায় পা দেয়া ঠিক না”- এ কথার সত্যতা স্বচক্ষে দেখতে পেলাম। মর্ম না বুঝলেও আমার কাছে ব্যাপারটা অনেক বেশী ফানি লেগেছিলো। সাব্বিরের এই ঘটনায় আমিই সেদিন সবচেয়ে বেশী হেসেছিলাম। আজও মনে পরলে হাসি পায়।

ছোটবেলায় এই প্রবাদটার মাথমুণ্ডু কিছু বুঝতাম না। ভাবতাম, আমরা শহরের পোলাপান। নৌকায় ওঠার তো প্রশ্নই আসে না। সেদিন না হয় শখে উঠেছিলাম, আর তো উঠবো না। তবে ওই ঘটনার পর পরই আমি সাঁতার শিখেছিলাম। যাই হোক, দুই নৌকায় পা দেয়ারও দরকার নেই। ডুবে মরারও দরকার নেই। ইনফ্যাক্ট, নৌকাই ওঠারই দরকার নেই। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে সেরকম না। চোখের সামনে প্রবাদটার সচিত্র ভার্শন দেখার পরও আমার মধ্যে চেঞ্জ এলো না। প্রবাদটার মর্ম বুঝতে বেশ সময় লাগলো এবং একারনেই ঘটলো এক ঐতিহাসিক ঘটনা-
—————————————————-
ঢাকার নামকরা একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ি আমি। বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনায় চরম বাজে। লেখাপড়া একদম ভালো লাগে না। সত্যি বলতে, মাথায় ঢোকে না। তবু জোর করে ঢুকানোর চেষ্টা করি। ফলাফল- রিটেক। কতোগুলো সাবজেক্টের রিটেক জমেছে, গুনতে গেলে মাথা চিনচিন করে। তাই গোনা ছেড়ে দিয়েছি। যা হয়, হবে।
তবে ক্লাসে আমার বেশ নামডাক রয়েছে, মডেল হিসেবে। কয়েকটা ছোটখাটো বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছিলাম। কোন কারনে সেই বিজ্ঞাপনগুলো আজো প্রকাশ হয়নি, তাই মনটা একটু খারাপ থাকে। তবে যাই হোক, সবাই মডেল বলে সম্মান দেয়। শুনতে ভালোই লাগে। (অবশ্য, ওরাও সঠিক জানে না আমি কোন প্রোডাক্টের মডেল হয়েছিলাম)
ভালই কাটছিলো ভার্সিটির দিনগুলো। ওহ, বলতে ভুলে গেছি- ক্লাসে আমার একটা GF আছে। দেখতে পরীর মতো। শুধু ডানা নেই, এটাই পার্থক্য। বলা যায়, তার কথাতেই আমি উঠি- বসি। নিজেকে তার মাঝে হারিয়ে ফেলেছি। ফলে, কোনটা তার ইচ্ছা কোনটা আমার ইচ্ছা- আলাদা করতে বেশ সময় লেগে যায়। তার সৌন্দর্য্য আমার ব্যাক্তিত্বকে বেশ সাশ্রয়ী মূল্যেই কিনে নিয়েছে। মাঝে মাঝে তাই একটু আফসোস লাগে তবে, দুঃখ নেই। কারন, অর্পিতা এটাই পছন্দ করে। মানে, আমার GF…
ক্লাসে যতটুক সময় কাটাতাম, তার দ্বিগুণ সময় কাটাতাম ধানমণ্ডি লেকে। এছাড়া ভারী পকেট খুব দ্রুত হালকা করার জন্য KFC, CFC- তো আছেই।

এর মধ্যে একদিন, জুনিয়র ব্যাচের এক মেয়ে, নিলিমার সাথে পরিচয় হলো। দেখতে অসম্ভব সুন্দরী। গায়ের রং বেশ ফর্সা। সে আবার আমার এক ফ্রেন্ডের cousin। ফ্রেন্ডের মাধ্যমেই তার সাথে পরিচয় হলো। এ ব্যাপারে অর্পিতা কিছুই জানলো না। কয়েকদিন কথা-টথা বলতেই মেয়ে পটে গেলো। আমিও আসলে মনের অজান্তেই পটিয়ে ফেললাম মেয়েকে। ভাবলাম, ফ্রেন্ড হিসেবে থাকুক না। সমস্যা কি? সে অবশ্য আমাকে কয়েকবার দেখেছে অর্পিতার সাথে। আমাদের কোন চক্কর আছে কিনা জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলাম- Me and Arpita, just good friend…nothing else…
ধীরে ধীরে সময় গড়াতে লাগলো। কথা বলতে বলতে একসময়, মনের অজান্তেই তথাকথিত সেই ফ্রেন্ডের উপর আমার দুর্বলতা, সিডরের বেগে বৃদ্ধি পেতে লাগলো। ফ্রেন্ড হিসেবে থাকার ট্রেন্ড বেশীদিন লাস্টিং করলো না। একসময় বুঝতে পারলাম, আমি আসলে নিলিমার প্রেমে পড়ে গেছি। বরং বলা উচিত, আরেকবার প্রেমে পড়েছি। তাও বিশেষ কোন কারন ছাড়াই। কিন্তু অর্পিতা? ওর কি হবে? ওকেও তো ভালোবাসি! নিলিমা যদি ‘CPU’ হয়ে থাকে অর্পিতা ‘MOTHERBOARD’. কাকে বাদ দিবো? পুরো PC অচল হয়ে পড়বে। থাক, দরকার নেই। তারচেয়ে বরং দুজনই থাকুক। আমি নাহয় একটা 4GB RAM লাগিয়ে নিবো দ্রুত দৌড়ানোর জন্য। বিশেষ কোন ঝামেলা হলে ‘Kaspersky’ আর ‘Norton’- দুইটা ANTIVIRUS-ই একসাথে চালাবো। ব্যাপার না।

শুরু হলো নতুন খেলা। ১ ফুল ২ মালী। নিজেকে ফুল বলতে যদিও লজ্জা লাগছে তবে, এখানে এই প্রবাদটাই যায়। তাই না দিয়ে উপায় নেই।
একসাথে দুই দুইটা গার্লফ্রেন্ড হ্যান্ডেল করা_ So Tough
তবে বুঝতে পারছিলাম, এটা একটা আর্ট। শিল্পের কাছাকাছি কিছু। যারা পারে, আর্টটা শুধুমাত্র তাদের জন্য। আমি ধীরে ধীরে এই আর্টের উপর মাষ্টার ডিগ্রী লাভ করলাম। কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেলো না আমার এই Double চক্করের কথা। আমার কিন্তু বেশ মজাই লাগছিলো। Double আনন্দে কাটছিলো দিনগুলি।
Double চক্করের জন্য আমারও কিছু জিনিষ Double করতে হলো। জিনিসগুলো হলো- মোবাইল, আর ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট। এই দুইটা জিনিষ ১ থেকে ২ হয়ে গেলো। দুজনকে সমান অধিকার দেয়ার সুবিধার্থে।
এভাবে চললো দীর্ঘ ৬ মাস। এর মধ্যে আমার কোনপ্রকার কোন সমস্যা হয়নি। সুকৌশলে সব ধরনের ঝামেলা কেটে বেরিয়ে আসছিলাম। নিকট কিছু বন্ধু যারা আমার এই Double চক্করের কথা জানতো, তারা এ ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশী দুশ্চিন্তা করতো। কয়েকজন অবশ্য হিংসাও করতো। ওরা মাঝে মাঝে বলতো- “দোস্ত, এভাবে কয়দিন চালাবি? একদিন ঠিকই ধরা খাবি। চোরের ১০ দিন গৃহস্থের ১ দিন”।
আমি অবশ্য ওদের এসব কথা কর্ণপাত করতাম না। ওরা এধরনের কথা শুরু করলে আমি ওদেরকে আর্ট নিয়ে বিশাল একটা বক্তৃতা শুনিয়ে দিতাম।
৬ মাস পর একদিনের ঘটনা-

সকালে অর্পিতাকে ফোন করে বলেছি ,শরীর খারাপ। আজ ক্লাসে আসবো না। আমি না গেলে অর্পিতাও আসবে না। আসল কথা হলো- আমি নিলিমাকে কথা দিয়েছিলাম, ওকে নিয়ে আজ ধানমণ্ডি লেকে বোট দিয়ে ঘুরবো।
তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে গেলাম বাথরুমে। দেরি হলে নিলিমা রাগ করবে। অল্পতেই খুব রাগ করে মিষ্টি মেয়েটা। রাগান্বিত মুখটা দেখতেও খুব ভালো লাগে। তাই ভাবলাম আজকেও একটু রাগাবো। নির্ধারিত সময়ের ১০ মিনিট পর বাসা থেকে বের হলাম।

যেয়ে দেখলাম নিলিমা দাড়িয়ে আছে। মুখ রক্তবর্ণ। এক মিনিটের জন্য মনে হলো, আমার Double চক্করের কথা জেনে যায়নি তো? তাহলে তো সর্বনাশ! এক টিকেটে দুই সিনেমার আজকেই ‘The End’
পরক্ষনে ভাবলাম, নাহ। ওর তো কোনভাবেই কিছু জানার কথা না। বুকে সাহস সঞ্চয় করে কাছে গেলাম। ও আমার দিকে তাকালো না। আমি হাত ধরে ভয়ে ভয়ে বললাম- Sorry my love.. রাস্তায় অনেক জ্যাম ছিলো। তাই আসতে লেট হয়ে গেলো। Forgive me, please…
আরও প্রায় মিনিটখানেক অনুনয়- বিনয় করার পর নিলিমা আমার দিকে ঘুরে তাকালো। মুখ তখনও রক্তবর্ণ। আমার কলিজা ধুকপুক করছে, আসলেই ও সবকিছু জেনে জায়নি তো।
-ওকে, নেক্সট টাইম যেনো এরকম আর না হয়, নিলিমা মিষ্টি স্বরে বললো। আমি জান ফিরে পেলাম। যাক, আমি যা ভাবছিলাম তেমন কিছু না। হাসিমুখে দুজনে যেয়ে একটা বোট ভাড়া করে চড়ে বসলাম। মেঘলা আকাশ, মিষ্টি হিমেল বাতাস, প্রেম করার জন্য পারফেক্ট একটা ওয়েদার। নিলিমাকে আরেকটু খুশি করার জন্য তিন লাইনের একটা কবিতাও বানিয়ে ফেললাম-

তুমি আকাশের বুকে- বিশালতার উপমা,
তুমি আমার চোখেতে- সরলতার প্রতিমা,
ওগো- তুমি যে আমার হৃদয়ের নিলিমা…….

নিলিমা সাথে সাথে বলে উঠলো- এই, এটা তো একটা গানের কথা! তুমি নিজে বানিয়েছো বললা ক্যান?
আমি থতমত খেয়ে বললাম- গান? ও হ্যাঁ, তাতে কি? শেষের লাইনটা তো আমার নিজেরই বানানো।
নিলিমা হেঁসে কুটিকুটি। আকাশ আরও মেঘলা হয়ে এলো। আমরা বোট চালাতে চালাতে আরেকটু ভেতরের দিকে গেলাম। সেখানে আরও কিছু couple বোট চালাচ্ছিলো। শুধু একটা বোটে দেখলাম, দুইটা মেয়ে। তাদের বোটটার পাশ কাটাতেই আমার আত্মা, খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চাইলো। পেট মুচড়িয়ে উঠলো। নিলিমা বলল- এই, এটা তোমার বান্ধবী অর্পিতা আপু না?
আমি না বুঝার ভান করে বললাম- কি যে বলো, ও এখানে কি করবে? আজ ও আসেনি। তুমি অন্য কাউকে দেখেছো।
- নাহ, আমি শিওর এটা অর্পিতা আপু, নিলিমা ঝাঁঝালো সুরে বলে।
এক মুহূর্ত দেরি না করে আমি বোটের মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে গতি বাড়ানোর চেষ্টা করলাম। তেমন কাজ হলো না। ওদিকে নিলিমাও একমুহূর্ত দেরি না করে গলা ছেড়ে ডাক দিলো- “অর্পিতা আপুউউউউউউউ”———

পর মুহূর্তে দেখলাম, অর্পিতার বোটটা আমাদের বোটের দিকে খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে। অর্পিতার পাশে বসা ওর cousin নোভা, বিশ্রী ভাষায় আমাকে নিয়ে কি যেনো বলছে বেশ জোড়ে জোড়ে। আমি বোটের গতি জান-প্রান দিয়ে বাড়াতে লাগলাম। নোভার কিছু কথা কানে ভেসে এলো- ‘ভালো করেছি আজকে তোমাকে জোর করে এখানে এনে, ওই লুচ্চাটাকে আমি আগে থেকেই সন্দেহ করতাম’……
নিলিমা কিছু না বুঝতে পেরে বোকার মতো হা করে তাকিয়ে রইলো। আমাদের বোট তখনও পাড় থেকে বেশ খানিকটা দূরে। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। ওদের বোটটা প্রায় কাছাকাছি এসে পরলো। নোভার অকথ্য গালাগালিতে নিলিমাও এতক্ষনে ব্যাপারটা টের পেয়ে গেছে। আমি আতংকে উঠে দাঁড়ালাম। বেশ দূর দিয়ে আরেকটা বোট যাচ্ছিলো। সেই বোটে ছিলো Single একটা ছেলে। কোন কিছু না ভেবে দ্রুত নিজের ভবিষ্যৎ পরিনতির দিকে ঝাপিয়ে পরলাম। ছেলেটাও ভয় পেয়ে দ্রুত বোটটাকে পাশ কাঁটিয়ে নিলো।
ফলাফল- ঝপাং……………….
পানিতে পড়ার আগ মুহূর্তে শুনলাম, দূর থেকে অতি- রসিক কেউ একজন চিৎকার করে বলছে-
‘মামা, দুই নৌকায় পা দিসেন, তো মরসেন’………….
সাতার জানা না থাকলে প্রেমের মরা, খুব দ্রুতই জলে ডুবে যেতো।

যে আলো নেভেনা কখনও…

26 নভে

1

 

সন্ধ্যা ৭টা। দাড়িয়েছিলাম মিরপুর ১১ নাম্বার ব্যাস স্ট্যান্ডে। আমার বাসা পুরান ঢাকায়। মিরপুরে এসেছিলাম আমার  মেজো ফুপুর বাসায়। এখন বাসায় যাবো। কিন্তু কোন সি.এন.জি অথবা বাস দেখছি না। ১৫ মিনিট ধরে দাড়িয়ে আছি। শেষে কি মনে করে যেনো ঠিক করলাম, রিক্সায় যাবো। জানি এতদূর কোনও রিকশা যেতে চাইবে না তারপরও। চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি?

কয়েকটা রিক্সাকে জিজ্ঞেস করাতে তারা তো আকাশ থেকে পরলো! একজন তো বলেই বসলো, ভাইজান কি ঢাকায় নতুন নাকি? আমি কথা বাড়ালাম না। আমি জানি, আমার মধ্যে কিছু পাগলামি আছে যা মাঝে-মধ্যে নাড়া দেয়। তখন যেটা করতে ইচ্ছা হয় সেটা করে ছাড়ি। আজকেও ঠিক করলাম, যত রাতই হোক; রিক্সা করেই বাসায় যাবো।

আরও ১৫ মিনিট পার হয়ে গেলো। আমি তখনও দাড়িয়ে। হাল ছাড়ছি না। দেখি, কি হয়। অনেকক্ষণ ধরেই এক বুড়ো রিক্সাওয়ালা দূর থেকে আমাকে দেখছিলো। আমি জিনিষটা পরে খেয়াল করেছি। কিছুক্ষন পর সে আমার সামনে এসে হাসিমুখে বলল- কোথায় যাবেন বাবা? আমি একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বললাম- যেখানে যাবো সেখানে কি আপনি যেতে পারবেন? সে বলল- বলেন না বাবা, যদি সাধ্যে কুলায় তো যাবো আর না পারলে তো নাই। আমি বললাম- যাবো পুরান ঢাকা, সুত্রাপুর। যাবেন আপনি? রিক্সাওয়ালা তখন একগাল হেঁসে বলল- আপনি সত্যিই যাবেন? আমি তখন একটু কড়া গলায় বললাম- না গেলে কি ইয়ার্কি করার জন্য এখানে দাড়িয়ে আছি? যদি পারেন তো চলেন আর না পারলে বিদেয় হন। রিক্সাওয়ালা খানিক কি যেন চিন্তা করে বলল- ঠিক আছে বাবা। চলেন। আপনের যেহেতু সাধ হইসে। পূরণ কড়া দরকার।  তবে বাবা একটু ধীরে যাবো। আমার একটু সমস্যা আসে। আমি ভাবছিলাম বুড়ো মানুষ, এতদূর টানতে পারবে কিনা, রাজি তো হয়ে গেলাম। রিক্সাওয়ালাটা বুড়ো হলেও তার দৈহিক গঠন খুবই ভালো। বেশ লম্বা, চওড়া আর পেটা শরীর। কি মনে করে যেনো চড়ে বসলাম।

আনুমানিক একটা হিসাব করলাম। যদি সাধারন গতিতেও যাই তারপরও বাসায় পৌঁছাতে প্রায় ৩ ঘণ্টা লেগে যাবে। আরও বেশিও লাগতে পারে। সেটা ব্যাপার না। বাসায় পৌঁছাতে পারলেই হলো। রিক্সাওয়ালাকে দেখলাম একটা টোকাই পিচ্ছিকে দিয়ে পাশের দোকানটা থেকে কয়েক খিলি পান কিনালো। এরপর বাচ্চাটাকে খুশি হয়ে ২ টাকা দিলো। বাচ্চাটা খুশিমনে ২ টাকা নিয়ে নাচতে নাচতে চলে গেলো। দীর্ঘ এই যাত্রায় পানগুলো হয়তো তার নিশ্চুপ সঙ্গির ভুমিকা পালন করবে। ভাড়া ঠিক করে উঠিনি। বুড়ো মানুষ। ঠিক করলাম, ভালো একটা রকম দিয়ে দেবো। ঠকিয়ে লাভ নেই।

রিক্সা চলতে শুরু করলো। আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। শীত নামতে শুরু করেছে। বাতাস ভালই ঠাণ্ডা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে হয়তো পুরোপুরি শীত নেমে যাবে। ভালই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ রিক্সা জ্যামে পড়লো। এতো প্রশস্ত ফাঁকা রাস্তায় কিসের জ্যাম বুঝলাম না। সামনে ঝুকে দেখলাম, দুইজন রিক্সাওয়ালা নিজেদের মধ্যে মারামারিতে ব্যাস্ত। তাই জ্যামটা লেগেছে। এদিকে পিছন থেকে একটা এ্যাম্বুলেন্স সমানে সাইরেন দিয়ে যাচ্ছে। কারও কোনও মাথা ব্যাথা নেই। সবাই রিক্সাওয়ালাদের মারামারি দেখায় ব্যাস্ত। কয়েকজনকে দেখলাম বেশ মজাও পাচ্ছে। উস্কানিমূলক কথাও বলছে কেউ কেউ। এরকম অসহায় অবস্থায় একটা এ্যাম্বুলেন্স পরে আছে দেখে নিজেই নামলাম। অবশ্য, ততক্ষনে দেখলাম তাদের মারামারিও শেষ হয়ে গেছে। একজন আরেকজনকে হুমকি দিতে দিতে চলে গেলো। জ্যাম ছুটলো। রিক্সা আবার চলতে শুরু করলো। মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো। কি দেশে বাস করি আমরা! এখন পর্যন্ত যানজটই নিরসন হলো না। চরম বিপদগ্রস্ত অবস্থায়ও মানুষের জ্যামে পরে থাকতে হয়। কারও একটু মাথা ব্যাথা নেই। কি হবে এই দেশের? ধুর…

শেষের কথাগুল কিছুটা জোরেই বলে ফেললাম। রিক্সাওয়ালা ঘাবড়ে গিয়ে বলল- কি হলো বাবা? হঠাৎ দেশের উপর এতো ক্ষিপ্ত হলেন কেন? আমি বললাম- আর কি করবো বলেন? রাস্তার মাঝখানে দাড়িয়ে দুইজন রিক্সাওয়ালা হিন্দি ফিল্মের মতো মারামারি করে আর সবাই বসে বসে মজা দেখে। কেউ একটু এগিয়ে আসে না। পিছনে যে একটা এ্যাম্বুলেন্স আঁটকে আছে সেদিকে কারও খেয়ালই নেই! দেশের মানুষগুলো যেনো কেমন হয়ে গেছে। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি মায়া উঠে গেছে। নাহ, এই দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

রিক্সাওয়ালা বলল- বাবা, একটা কথা বলি কিছু মনে করবেন না। আপনারা এ যুগের ছেলেপেলে। তরুন প্রজন্ম। দেশপ্রেম কি, সেটা আপনারা এখনও ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেন নাই। তাই দেশকে নিয়ে কিছু বলার আগে চিন্তা করে বলবেন বাবা। কারন, আমরা জানি দেশ কি জিনিষ! কত বড় সম্পদ! এটা আপনাদের বোঝার বাইরে।

আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম- চাঁচা, আপনার কথাবার্তা শুনে তো মনে হয় আপনি পড়ালেখা করেছেন। তা কতদূর পরেছেন? রিক্সাওয়ালা একটু হেঁসে বলল- তা বাবা, এইট পাশ বলতে পারেন। ভালো ছাত্র ছিলাম। নাম্বারও ভালো ছিলো। বৃত্তিও পেয়েছিলাম। পড়ার খুব শখ ছিল বাবা, কিন্তু এরপর আর পড়া হয়নি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম- কেনো চাঁচা? কি সমস্যা ছিলো? রিক্সাওয়ালা বলল- সে আরেক কাহিনী বাবা। আপনাদের মতো তরুন প্রজন্ম কি সেই কাহিনী শুনতে আগ্রহি হবে? আমি বললাম- আরে চাঁচা, নির্দ্বিধায় বলে ফেলেন। আর আপনি যেরকম ভাবছেন আমি সেরকম না। দেশপ্রেম আমার মধ্যেও আছে। তখন মেজাজটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো তাই ওরকম কথা বলেছিলাম। তাছাড়া, আমার লেখালেখিরও অভ্যাস আছে। আপনার কাহিনী ভালো লেগে গেলে হয়তো সেটা নিয়েও লিখে ফেলতে পারি। মনে মনে ভাবলাম- যাক, দীর্ঘ যাত্রাটা খুব একটা বোরিং হবে না।

রিক্সাওয়ালা মুখে এক খিলি পান ঢুকিয়ে শুরু করলো তার কাহিনী-

১৯৭১ সাল, তখন আমার বয়স ১২ কি ১৩। বাবা মা’র দ্বিতীয় সন্তান আমি। আমার বড় আরেক ভাই আছে। সে তখন যুবক। সেও পড়াশুনা করে। মোটামুটি সচ্ছল পরিবার ছিলো আমাদের। বাবা ছিলেন গ্রামের একজন গণ্যমান্য ব্যাক্তি। পঞ্চায়েতে বিচার-আচার করতেন। যাই হোক, আমি তখন ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়ে সবে নাইনে উঠেছি। মনে টানটান উত্তেজনা, কবে ম্যাট্রিক পাশ করবো, কবে কলেজে যাবো? মনে অনেক স্বপ্ন। হঠাৎ করেই দেশে শুরু হয়ে গেলো গণ্ডগোল। যাকে বলে স্বাধীনতার যুদ্ধ। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবকিছু কেমন যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো। শোনা গেলো- পাকিস্তানি মিলিটারিরা নাকি গ্রামে ঢুকে গেছে। চোখের সামনে যাকে পাচ্ছে, গুলি করে মারছে। গ্রামের তরুন যুবকেরা হাওয়া। পরে শুনেছিলাম, তারা দলে দলে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছে। যোগ দিলো আমার বড় ভাইও। কাউকে কিছু না বলেই চলে গেলো। অবশ্য বাবা- মা’র কাছে নাকি একটা চিঠি লিখে গিয়েছিলো। সেই চিঠি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। যাই হোক, আমার বাবা –মা তো কান্নায় ভেঙ্গে পরলেন। অনেক আদরের ছিলো আমার বড় ভাই। আমিও চোখের পানি বিসর্জন দিয়েছিলাম নীরবে। ঘরে আমরা তখন খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম। যে কোন মুহূর্তে মিলিটারিরা আমাদের গ্রামেও চলে আসতে পারে। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। আমার বাবা কোনমতেই গ্রাম ছাড়তে রাজি হলেন না। আমরাও আর বৃথা চেষ্টা করলাম না। এর মধ্যে একদিন আমাদের গ্রামের আরেক গণ্যমান্য লোক; বাবার বন্ধুই ছিল লোকটা, নাম- রমিজ উদ্দিন- এলেন আমাদের বাসায়। বিভিন্ন রকম প্রশ্ন করতে লাগলেন বাবাকে। জানতে চাইলেন, আমার বড় ভাই কোথায়? বাবা আসলে বুঝতে পারেননি রমিজ উদ্দিনের মনে কি ছিলো। তিনি উত্তরে বলেছিলেন- ‘আমার ছেলে যেখানেই থাকুক, আল্লাহ্‌ ওদের সাথে আছেন। আমি ওদের জন্য দোয়া করি’।

এই কথা শুনে রমিজ উদ্দিন চলে যায়। তার দিন তিনেক পর আমাদের গ্রামেও মিলিটারিরা ঢুকে পরে। অবাধে হত্যা চালাতে থাকে। আমরাও ঘরে বসে আসন্ন মৃত্যুর অপেক্ষা করছিলাম। বাবা অবশ্য এক মুহূর্তের জন্যও ভয়ে পাননি। আমরা ভিতরের ঘরে ছিলাম। বাবা ছিলেন সামনের ঘরে।  হঠাৎ আমাদের দরজা ভাঙ্গার শদ হলো। ঘরে রমিজ উদ্দিন-এর গলা শুনতে পেলাম। সাথে কয়েকজন পাকিস্তানি মিলিটারি। তারা বাবা কে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করতে লাগলো আমার বড় ভাইয়ের কথা। কোথায় গেছে, সাথে কয়জন আছে এইসব। বাবা তখনও একই উত্তর দিয়েছিলেন। সাথে সাথে বিকট শব্দে তাদের রাইফেল গর্জে উঠলো। বাবা কে মেরে ফেলা হলো। মা সইতে না পেরে ছুটে গেলেন। তাকেও সাথে সাথে প্রান দিতে হলো। আমিও সইতে পারলাম না। ছুটে গেলাম। উদ্দেশ্য ছিলো, মরার আগে রমিজ উদ্দিনের হৃদপিণ্ডটা টেনে বের করে ফেলবো। পারলাম না। মাথায় বেশ জোরে কেউ ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করলো। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরলাম। যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখলাম আমি আমাদের স্কুলের একটা ঘরে বন্দি। হাত বাধা। আমাকে তারা মেরে ফেলল না কেনো বুঝতে পারলাম না। হয়তো তারা ভাবছিলো, আমি আমার ভাইয়ের ব্যাপারে তাদেরকে কিছু বলবো। কিছুক্ষন পর ঘরে ঢুকলো দুইজন মিলিটারি, সাথে রমিজ উদ্দিন। ওকে আমি একদমই সহ্য করতে পারছিলাম না। শালা নিজের দেশের মানুষের সাথে বেঈমানি করলো। রাগে- ক্ষোভে আমার শরীর কাঁপছিলো। সুযোগ খুঁজছিলাম, কি করা যায়। জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য এক মিলিটারি আমার হাতের বাঁধনটা হালকা করে দিলো। আমি আসতে আসতে উঠে দাঁড়ালাম। রমিজ উদ্দিন আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিলো। আমি কোন কিছু চিন্তা না করে দৌড়ে গিয়ে রমিজ উদ্দিনের বুকে প্রচণ্ড জোরে একটা লাথি মারলাম। সাথে সাথে সে তার ভারী শরীরটা নিয়ে লুটিয়ে পড়লো। মনে এক ধরনের শান্তি পেলাম। মিলিটারিগুলোও মজা পেলো। তারা রমিজ উদ্দিনকে পড়ে যেতে দেখে জোরে জোরে হাঁসতে লাগলো। রমিজ উদ্দিন উঠে এসে আমাকে প্রচণ্ড জোরে রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করলো। আবার জ্ঞান হারালাম। এরপর থেকে শুরু হলো আমার উপর অমানবিক নির্যাতন। সারাদিন ঘরটাতে বন্দি করে রাখতো। ঠিকমতো খেতে দিতো না। কোন রকম অত্যাচার বাদ দিলো না। তবে যথেষ্ট প্রানশক্তি থাকায় সেগুলো কোনরকমে সয়ে যাচ্ছিলাম। এর মধ্যে একদিন পালানোর সুযোগ পেলাম।

মৃত্যু তখন আমার কাছে তুচ্ছ তাই, রাতের অন্ধকারে জানালার শিক গলে চরম বিপদজনক অবস্থার মধ্য দিয়ে পালিয়ে গেলাম। আমার দেশের পথ তারা নিশ্চয়ই আমার চেয়ে ভালো চিনবে না। বুকে ভর দিয়ে সেখান থেকে চলে এলাম। কেউ টের পেলো না। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা না থাকলে এটা সম্ভব হতো না। অনেক কষ্টে লাঠিতে ভর করে হেঁটে পৌছালাম পাশের একটা গ্রামে। দূরে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘরে হারিকেনের আলো দেখতে পেলাম। সেদিকেই এগোলাম। জানিনা সেখানে কারা আছে। প্রচণ্ড খিদা আর ক্লান্তির জন্য এসব চিন্তা তখন মাথায় আসেনি। কুঁড়ে ঘরটার সামনে যেয়ে আরও একবার জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরলো দেখলাম, আমি একটা ছোট্ট খাটে শুয়ে আছি। পাশে আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু ‘শফিক’ ভাই। বুঝলাম, আমি এখন একটা মুক্তিবাহিনীর দলের সাথে আছি। এরপরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত। শফিক ভাইকে আমার ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করাতে সে কোনও উত্তর না দিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে ছিলো। তার গাল বেয়ে পানি পড়ছিলো। ঘটনা বুঝতে পেরে আমিও আর কথা বাড়াইনি। যোগ দিলাম সেই মুক্তিবাহিনীর দলে। অনেক অপারেশনে গিয়েছি। তবে আমার একটা সমস্যার কারনে বড় অপারেশনগুলোতে যেতে পারিনি। শফিক ভাই-ই  যেতে দেননি। নিজের ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন তিনি। যাই হোক, যুদ্ধ করলাম। ছিনিয়ে আনলাম বিজয়। চোখের সামনে অনেক কিছুই দেখলাম, হারালাম, পেলাম। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে সবচেয়ে বড় যেটা পেলাম তা এই স্বাধীন বাংলাদেশ। তাই দেশ নিয়ে উলটা-পালটা কিছু শুনলে খুব খারাপ লাগে, বুঝলেন বাবা। দেশের কোন দোষ নাই। যারা দেশটাকে চালাচ্ছে দোষটা তাদের দেন। তারা ঠিকমতো চালাতে পারছেনা বলে আজকে তরুন প্রজন্ম দেশের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। তাদের মধ্যে দেশপ্রেম কমে যাচ্ছে। দেশটা ঠিকমতো চালানোর দায়িত্ব আপনাদের। আপনারা ইচ্ছা করলেই পারেন দেশকে সুন্দরভাবে চালাতে। আমারা তো আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি বাবা, বাকিটা আপনাদের তরুন প্রজন্মের দায়িত্ব। কিছু করেন বাবা, কিছু করেন।

ঘটনা শুনতে শুনতে কখন যে বাসার সামনে চলে এসেছি খেয়ালই করিনি। চাঁচার ঘটনা শোনার পর কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। বাসার দরজার সামনে রিক্সা থামালাম। কিছু প্রশ্ন মনে উকি দিচ্ছে। রিক্সা থেকে নেমে বললাম- চাঁচা, আপনি তো দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আপনি কেন রিক্সা চালাচ্ছেন? আপনি সরকারের সাথে যোগাযোগ করেন দয়া করে, না হলে আমাকে বলেন, আমি সব করে দিচ্ছি। রিক্সাওয়ালা চাঁচা খানিকটা হেঁসে বললেন- কি লাভ বাবা! সরকারকে বললে সরকার কি করবে? সম্মান দিবে? টাকা দিবে? ঘোষণা করে দিবে যে ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা’ এ-ই তো? আমার এগুলোর প্রতি কোনও লোভ নেই বাবা। আমি এসব চাই না। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি দেশকে ভালবাসি বলে, দেশের মানুষকে ভালবাসি বলে। তাদের ভালবাসার প্রতিদান আমি এভাবে আদায় করতে চাই না বাবা। আমি জানি আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। লোকে জানুক, না জানুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না।

আমি মানতে পারছিলাম না। আমাদের দেশের সরকাররা কি এখনও উনাদের প্রাপ্য সম্মান উনাদেরকে দেবেন না? নাকি তারা সম্মান প্রদানে অক্ষম? জানি, এই প্রশ্নের জবাব কেউ দেবে না। যাই হোক, চাঁচাকে আমার ছাড়তে ইচ্ছা করছিলো না। আরও অনেকক্ষণ তার সাথে কথা বললাম। তার সম্পর্কে আরও যা জানতে পারলাম তা হলো, সে নিউমার্কেটের কাছে এক বস্তিতে থাকে। একা মানুষ। বিয়ে করেননি। সারাদিন বস্তির বাচ্চাদের বিনামূল্যে পড়ান আর রাতে রিক্সা চালান। গ্রামে তাদের যে বাড়িটা ছিলো সেটার বেশীরভাগই দখল হয়ে গেছে। যতটুক তিনি পেয়েছেন সেখানে তার একটা স্কুল করার ইচ্ছা আছে। এজন্য তিনি টাকা জমাচ্ছেন। শেষ একটা প্রশ্ন তাকে না করে পারলাম না।

-আচ্ছা চাঁচা, আপনি যে রমিজ উদ্দিনের বুকে লাথি মেরেছিলেন, সে আপনাকে কিছু না বলে এভাবেই ছেড়ে দিলো?

জবাবে তিনি ডান পা’টা সামনে এনে দেখালেন। পা’টা গোড়ালি থেকে কাঁটা…………………

হতভম্ব হয়ে গেলাম। একবারও জিনিষটা চোখে পরেনি। এক পায়ে রিক্সা চালিয়ে তিনি আমাকে এতদূর নিয়ে আসলেন, আমি একমুহূর্তের জন্যও বুঝিনি! এজন্যই সে ধীরে আসার কথা বলছিলো। আর পারলাম না। চোখ ফেটে  পানি বেরিয়ে এলো। এ কেমন দেশপ্রেম তাদের! কোন মাটি দিয়ে তৈরি এরা? নিজের সবকিছু হারিয়েও তারা দেশের সেবা করে যাচ্ছে, দেশের মানুষের সেবা করে যাচ্ছে! দেশের জন্য যুদ্ধ করে এখন সে জীবন যুদ্ধে লিপ্ত। তার যুদ্ধ এখনও থামেনি। এ যুদ্ধ কি আদৌ থামবে? তবু তার কোনও দাবি নেই, নেই কোন অভিমান এমনকি অভিযোগ! কোন উত্তর খুজে পেলাম না। মানিব্যাগ বের করে ভাড়া দিলাম। খুশি হয়ে যা ভাড়া তার চেয়ে ১০০ বেশি দিতে চাইলাম কিন্তু সে কিছুতেই নিলো না। পরে অনেক কিছু বলে- কয়ে বুঝালাম যে, ভাতিজা হিসেবে অন্তত নেন। তখন সে টাকাটা নিলো। তার ঠিকানাটাও রেখে দিলাম। মনে-প্রানে চাইলাম, তার সাথে আবারও দেখা হোক। এরকম দেশপ্রেমিক যোদ্ধার সাথে আমাদের মতো তরুন প্রজন্মের যেনো আজীবন দেখা হতে থাকে- এই আশা নিয়ে বাসায় ঢুকলাম।

একটি নতুন বিজয়ের গল্প……

24 সেপ্টে

sssa

ঘটনাটা বাংলাদশেরই যে কোন একটা গ্রামের। খুব সুন্দর গ্রামটা। চারিদিকে প্রচুর সবুজ গাছ-পালা। দেখলে মনে হয় যেনো পুরো বাংলাদেশের প্রতচ্ছবি গ্রামটাতে ফুটে উঠেছে। ঘন সবুজ গাছপালা, ফাকে ফাকে সোনালি ধানক্ষেত। মনে হয় যেনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা। এই গ্রামটা দেখলেই বোঝা যায়, কেন বাংলাদেশকে সবুজের দেশ বলা হয়। সেই গ্রামেরই এক ছেলে, যাকে নিয়ে এই ঘটনা।

ছেলেটা মা’র খুব আদরের। বাবা তাকে তেমন একটা আদর দেয় না। সবসময় বকা-ঝকা করে। তাই বাবার সাথে তার তেমন একটা মিলে না। ২০০৯- এর জানুয়ারি মাসে তার বয়স ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এখন সে মোটামুটি অনেক কিছুই বোঝে। চটপটে আর দুরন্ত এই ছেলেটা সবকিছুই করে নিজের খেয়াল-খুশি মতো। তবে বড়দের সে যথেষ্ট সম্মান করে। কখনো কারো সাথে বেয়াদবি করে না। সারাদিন ঘুড়ি উড়ানো আর সাইকেল নিয়ে থাকে। মা এজন্য তাকে বকাও দেয় খুব। মানুষকে সাহায্য করার ব্যাপারটা তার মধ্যে প্রবল। নিজের ক্ষতি করে করে হলেও সে মানুষকে যথাসাধ্য সাহায্য করে। পড়ালেখায় তেমন একটা ভালো না তবে, বাস্তব জ্ঞান তার মধ্যে অনেক।

সেই বছরের ডিসেম্বর মাস। প্রচণ্ড শীত পড়েছে। গ্রামের লোকেরা বলাবলি করছে, এবারের শীতে বুড়োরা  নির্ঘাত মারা পড়বে। গত কয়েক বছরেও নাকি এমন শীত পরেনি। যাই হোক, সে মাসের প্রথম দিনটি থেকে সেই ছেলেটার মধ্যে দেখা গেলো একটা বিশেষ পরিবর্তন। তাদের বাড়ির পাশে অনেকগুলো বড় বড় গাছ আছে। সেগুলোর মধ্যে মাঝখানের একটা গাছ সবচেয়ে উঁচু, এবং খাঁড়া। আশে-পাশের সবগুলো গাছের মধ্যে এই গাছটা সবচেয়ে উঁচু। দেখে মনে হয় যেনো বাকি গাছগুলোর নেতা, মাঝখানে থেকে সবগুলো গাছকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ডালপালাও তেমন একটা নেই। তারপরও বিশেষ কি যেন একটা আছে গাছটার মধ্যে যা তাকে সবগুলো গাছের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। এই গাছটায় চড়ার জন্য হঠাৎ করেই ছেলেটা দিনরাত ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। অনেকেরই চোখে পড়লো ব্যাপারটা।

ঘুড়ি উড়ানো আর সাইকেল চালানোর পিছনে যে সময়টা ব্যায় করতো এখন সে ওই সময়টা ব্যায় করে এই গাছের পিছনে। আর কোন কাজ নেই। দিনরাত সে পরে থাকে গাছটার সামনে। বিকেলে বন্ধুরা খেলতে ডাকলে খেলতেও যায় না। স্কুল বন্ধ, তাই পুরো সময়টাই এখন সে গাছে উঠার চেষ্টায় ব্যায় করে। বন্ধুরা অনেকেই হাসাহাসি করে তার পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে। এত লম্বা আর খাঁড়া গাছ বেয়ে উপরে ওঠা কি মুখের কথা? তারপরও হাল ছাড়তে রাজি নয় ছেলেটা। যতবার সে পড়ে যায় ততবারই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাড়িয়ে আবার চেষ্টা করে। পিছন থেকে বন্ধুদের হাঁসি-ঠাট্টা কানে আসে ঠিকই কিন্তু সেগুলো সে গায়ে মাখেনা। নিজের মতো গাছে উঠার চেষ্টা করতে থাকে। এভাবেই চললো কয়েকদিন।

একদিন সন্ধ্যায় দুজন বুড়ো লোক গাছটার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ করেই তাদের সামনে ধপ্‌ করে ছেলেটা গাছের উপর থেকে পড়লো। লোকদুটো প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলো। এর মধ্যে একজন ছিলো ছেলেটার দাদা। উনি সামনে এসে ছেলেটার কান ধরে ইচ্ছামত মুচরে দিলো। দুটা চড়ও দিলো। ছেলেটার চোখ ফেটে বেড়িয়ে এলো পানি। পাশের বুড়ো লোকটা তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, ‘থাক, থাক। মাইরা আর কি হবে? ওরে ভালো করে বুঝাও এইরকম সন্ধ্যায়ে এসব গাছপালার সামনে থাকা ঠিক না। অনেকরকম খারাপ বাতাস লাগতে পারে’।

ছেলেটার দাদা তখন বললো, ‘সাধে কি আর মারি? ওরে কয়দিন কইসি এই গাছটার সামনে আইতে না। এই গাছে আমি খারাপ জিনিষ দেখসি। ওইদিন দুপুরেও ওরে দেখলাম গাছটার সামনে দাড়ায়া আসে। তুমিই কও ফজল মিয়া, যদি খারাপ কিসু হয়া যায় তখন আমি ওর বাপরে কি জবাব দিমু? বাপে সারাদিন বাসায় থাকেনা তাই আমারই তো দেইখা রাখতে হয়। ওর মা তো কিছুই কয়না। আরেকদিন দেইখা লই, তর বাপের কাছে নালিশ দিমু। আমি আর পারিনা, আমার বয়স হইসে’।

ছেলেটা মাথা নিচু করে দাড়িয়ে তাদের চলে যাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে। পাশের বুড়ো লোকটা যেতে যেতে বলে, ‘দোষ আসলে ওর না। দোষ হইলো আমাগো। পুরা বাঙালি জাতিগো দোষ। পারবিনা উপরে উঠতে, কেন উঠবি? শেষে হাত-পা ভেঙ্গে লুলা হয়ে ঘরে পড়ে থাকবি। বাঙ্গালীরা তো এজন্যই মরে। যেটা পারবো না সেটাও করতে চায়। আর যেটা না করবেন, ওইটা আরও বেশি কইরা করবে’……                                                                       আস্তে আস্তে কথাগুলো দূরে মিলিয়ে যেতে থাকে। লোকটার শেষ কথাগুলো ছেলেটার মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কাটে। ‘পারবিনা উপরে উঠতে, কেন উঠবি’? সেদিন সারাটা রাত ওর মাথায় এই একটা কথাই ঘুরতে থাকে। রাতে আর ঘুমাতে পারেনা।

পরদিন রাতে সে আবার চেষ্টা চালায়। যেভাবেই হোক, গাছটার মাথায় তাকে পৌঁছাতেই হবে। অর্ধেকও উঠতে পারেনি হঠাৎ ঘরের ভিতর থেকে মায়ের ডাক শুনতে পায় ছেলেটা। সাথে সাথে লাফিয়ে নেমে ঘরে ঢুকে যায়।

১১ তারিখ, শুক্রবার। দোকান-পাট সব বন্ধ, তাই ছেলেটার বাবা বাসায়। ছেলেটাও আজ তাই একটু ভয়ে ভয়ে আছে। গাছে উঠতে গেলে যদি বাবা দেখে ফেলে তাহলে আজই ওকে মেরেই ফেলবে। কারন, ওর বাবা সবসময় ওকে মারার অজুহাত খুজতে থাকে। সামান্য কোন অজুহাত পেলেই বেচারাকে পিটিয়ে আধমরা করা ফেলে। ওর মা’ও তখন থামাতে পারেনা। যাই হোক, ছেলেটা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে কখন ওর বাবা বাইরে যাবে। সারাটা দিন সুযোগের অপেক্ষায় কেটে যায় কিন্তু বাবা বাইরে যায় না। অবশেষে সন্ধ্যার দিকে একটা সুযোগ আসে। কি কাজে যেন ওর বাবা একটু বাইরে যায়। ছেলেটা তখন এক মুহূর্তও দেরি না করে দৌড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গাছটার সামনে আসে এবং দ্রুত ওঠা শুরু করে। বেশ কিছুক্ষন চেষ্টা করার পর এবার সে অর্ধেকেরও বেশি উপরে উঠে যায়। খুশির সীমা থাকেনা তার। মনে হয় এবার সে গাছটার মাথায় যেভাবেই হোক পৌঁছে যাবে।

ঠিক সেই মুহূর্তে ছেলেটা দূর থেকে তার বাবার গলার আওয়াজ শুনতে পায়। কিছু একটা বলতে বলতে গাছটার দিকে দৌড়ে আসছেন তিনি। ছেলেটা এই দৃশ্য দেখে ওইটুকু উচ্চতা থেকেই হাত ছেড়ে লাফিয়ে পড়ে। সাথে সাথে পা’টা মচকে যায়। প্রচণ্ডরকম ব্যাথায় মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকে ছেলেটা, কিন্তু ওর বাবার সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। দৌড়ে এসে ওকে টেনে-হিঁচড়ে ঘরে নিয়ে যায়। তারপর দরজা বন্ধ করে শুরু করে মার। প্রচণ্ডরকম মার খাওয়া সত্ত্বেও ছেলেটার গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হয়না। কারণটা…যাই হোক, ছেলেটার মা ঘরের পাশে দাড়িয়ে নীরবে অস্রু-বিসর্জন দিতে থাকে।

পা ব্যাথা এবং প্রচণ্ড মারের কারনে তিনদিন ছেলেটাকে বিছানায় পড়ে থাকতে হয়।

চতুর্থদিন রাতে- ব্যাথা পা নিয়ে শেষ চেষ্টা চালায় ছেলেটা। সে সময় পুরো গ্রাম ঘুমিয়ে ছিলো। কেউ জানলো না ছেলেটা তার লক্ষে পৌঁছাতে সফল হলো কিনা…

পরদিন, অর্থাৎ ১৬-ই ডিসেম্বর। দিনটা ছিল বুধবার। সকাল ৭টার দিকে বেশ কয়েকটা বাচ্ছা ছেলেকে দেখা গেলো গাছটার সামনে দাড়িয়ে আছে। অবাক হয়ে সবাই তাকিয়ে আছে গাছটার একেবারে উপরের দিকে।

দেখা গেলো…বেশ বড় সাইজের একটা বাংলাদেশের পতাকা সেখানে ঝুলছে। কারও বুঝতে বাকি রইলো না, এটা কার কাজ। কি উদ্দেশ্য কাজ করছিলো ছেলেটার গাছে উঠার পিছনে।

অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর, ছেলেটার জয় হলো। শত বাঁধা-নিষেধ অতিক্রম করে সে পৌছালো তার কাঙ্খিত লক্ষে। কোন কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারলো না। সবাই বুঝতে পারলো তার গাছে ওঠার কারন।

এরই নাম- ‘বাংলাদেশ’।

এরাই সেই বাঙালি জাতি যারা হার মানতে জানেনা। যারা হার মানেনি ‘একাত্তরেও’।

শত বাঁধা অতিক্রম করে অর্জন করেছে তাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য। ছিনিয়ে এনেছে বিজয় পতাকা, যা আজ স্থান পেয়েছে সবচেয়ে উঁচু জায়গায় এবং সগর্বে উড়ছে। যেনো ছেলেটার বিজয়কে অভিবাদন জানাচ্ছে। এই বিজয়, শুধু এই ছেলেটার একা নয়। এই বিজয়, পুরো বাঙালি জাতির বিজয়। কারন, এই ছেলেটার মধ্য দিয়েই অঙ্কিত হয়েছে পুরো বাঙালি জাতির সাহসিকতার কথা, একাগ্রতার কথা, বিজয়ের কথা। আজ বহুদিন পর যেনো আরও একবার বাঙালি জাতি নতুন করে কিছু একটা জয় করলো। স্বাদ পেলো নতুন কিছু বিজয়ের।

কিছুক্ষন পর সেই ছেলেটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে বাচ্ছাদের দলটার সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর সবাই একসাথে পতাকাটাকে স্যালুট করলো। পাশের স্কুলের মাইকটাতে তখন বেজে উঠলো জাতীয় সঙ্গীতের কিছু অংশ। ছেলেটার মা’ও তখন বেড়িয়ে এসে তাদের সাথে দাঁড়ালো। ছেলেটা তখন পতাকাটা দেখিয়ে হাতের ইশারায় তার মা’কে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করলো কারন, কথা বলার ক্ষমতা তার নেই। সে বাক-প্রতিবন্ধী, তবে কানে শুনতে পায়। মাত্র দেড় মাস বয়সে ছোট্ট একটা দুর্ঘটনায় ছেলেটা তার বাক্-শক্তি হারায়। যাই হোক, ছেলেটার মা বুঝতে পারলো সে কি বলতে চাইছে। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাথে সাথে সে তার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। তার প্রতিবন্ধী ছেলের উপর তার গর্ব বেড়ে গেলো। সেই গর্ব, অশ্রু হয়ে ঝরে পরতে লাগলো। গর্বের হাঁসি ফুটে উঠলো তার মুখে। সত্যিই এমন সন্তানের জন্ম দিয়ে সে গর্ব বোধ করে। গর্ব বোধ করি আমরাও। এমন সন্তানের জন্ম দেয়া, শুধু আমাদের মায়ের পক্ষেই সম্ভব। পৃথিবীর বুকে আমরাই একমাত্র জাতি যারা মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য শুন্য হাতে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পরেছি, হারিয়েছি সবকিছু, হাসতে হাসতে জীবন দিয়েছি, তবু শেষ পর্যন্ত মায়ের মুখে ঠিকই হাঁসি ফোঁটাতে পেরেছি। এমন সন্তানের জন্ম দিয়েছো তাই…সালাম তোমায় মা, সালাম দেশের মাটি, সালাম বাংলাদেশ। তোমায় সালাম……

অসমাপ্ত ক্ষুধা…

22 অগা

‘জামাল’।

একটা কাজের ছেলে। ঢাকা- শহরের অন্যতম এক ধনীর বাসায় সে কাজ করে। অনেক দূরের আত্মীয়তার সূত্র ধরে তার এখানে আসা। সে যেই বাসায় কাজ করে সেখানে তাকে বাদ দিয়ে আরও দুজন মানুষ থাকে। তাদের কথায় পরে আসছি।

জামাল খুবই ভদ্র- নম্র স্বভাবের একটা ছেলে। চুরি- ছ্যাঁচড়ামির অভ্যাস নেই। কখনো বাজার থেকে ২ টাকা ফেরত এলেও জামাল সেটা মালিকের কাছে দিয়ে দেয়। জামালের বয়স খুব বেশি না। ২০/২২ হবে। বাবা, মা কেউ নেই। দুইটা বোন আছে, তারাও মানুষের বাসায় কাজ করে। জামালের কাজ হলো বাসার দেখা-শুনা করা, আর মাঝে- মধ্যে বাজার করা। অনেকটা কেয়ার-টেকার টাইপ। বাসার অন্য দুইজনের কেউ ই সারাদিন বাসায় থাকে না। সকালে বের হয়, রাতে ফেরে। তারা স্বামী- স্ত্রী। জামালের মালিক লোকটা প্রচুর ধনী। মাঝে মাঝেই সে ব্যাবসার কাজে দেশের বাইরে যায়। সাথে স্ত্রীকেও নিয়ে যায়। তখন পুরো বাসায় জামালকে একা থাকতে হয়। এই জিনিষটা ওর একদম ভালো লাগে না। দম বন্ধ হয়ে আসে তালা-বদ্ধ ঘরে। ওর মালিকের একটা খারাপ অভ্যাস ছিলো। সেটা হলো, প্রতিদিন রাতে বাইরে থেকে মদ খেয়ে এসে জামালকে ইচ্ছামত পেটাতো। স্ত্রীকে সে বাঘের মতো ভয় পায়, তাই স্ত্রীকে না পিটিয়ে সে বাসার কাজের ছেলেকে পেটায়। পেটানোর সঠিক কারন জামাল তার স্বল্প জ্ঞান দিয়ে খুজে পায় না। অনেক দিন ধরেই এরকম চলছে। জামালও মার খেতে খেতে অভ্যাস্ত হয়ে পড়েছে। অবশ্য প্রথম দিকে ও ব্যাপারটা একদমই সহ্য করতে পারতো না। শেষে একদিন কাজ ছেড়ে দিয়ে বের হয়ে গেলো। কিন্তু ঢাকায় ওর পরিচিত কেউ নেই। কার কাছে যাবে? দুইদিন না খেয়ে থাকতে হলো তাকে। অবশেষে পেটের দায়ে ফিরে আসতে হলো কাজে। কেউ একজন ওকে বলেছিলো, ‘পেটে খেলে পিঠেও সইতে পারবি’। কথাটা ওর ভালো লেগে যায়। সেই থেকে ও সয়ে আসছে এই অমানুষিক অত্যাচার। মেনে নিয়েছে কঠিন বাস্তবতা। জামালের কাছে মনে হয়, পৃথিবীতে পেটের ক্ষুধার চেয়ে বড় আর কিছুই নেই।

জামালের মালিক ‘আনিস সাহেব’।

দেশের অন্যতম একজন শিল্পপতি। গুলশানের এক আলিশান ফ্ল্যাটে সে তার স্ত্রীকে নিয়ে থাকে। কোন সন্তান- সন্ততি নেই। কখনো হবেও না। ডাক্তার তা ই মনে করেন। যা হোক, তার সম্পত্তি প্রচুর। বেশিরভাগ সে একাই ভোগ করতে চায়। নিজের স্ত্রীকেও ভোগ করতে দেয় না। দিন দিন তার সম্পত্তির পরিমান বেড়েই চলেছে। কমার কোন নাম নেই। ব্যাবসার এমন কোন ক্ষেত্র বাকি নেই যেখানে সে টাকা খাটায়নি। প্রতিমাসে তার যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে অন্তত ২০/২৫টা পরিবার খুব ভালো ভাবে চলতে পারবে। তার এই আয়ের মূল উৎস হলো ‘চোরাকারবারি’ আর ‘স্মাগলিং। ব্যাপারটা আর কেউ না জানলেও জামাল খুব ভালো করেই জানে। ব্যাবসার আড়ালে লুকিয়ে এই কাজগুলো করে থাকেন জামাল সাহেব। কাউকে ভুল করেও সে কোনদিন একটা টাকা দান করে না। নিজের স্বার্থ ছাড়া সে  কখনোই কাউকে সাহায্য করে না। নিজের স্ত্রীকেও না। প্রতিদিন রাতে মদ খেয়ে বাসায় আসে আর কাজের ছেলেকে ইচ্ছামত মার-ধর করে। থামানোর কেউ নেই। স্ত্রী বুঝতে পারে, সন্তান না হওয়ার কারনেই তার এই মানসিক বিপর্যয়। তাই সে ও তখন বাধা দেয় না তাকে। কাজের লোকেরা তো মানুষের জাতের মধ্যে পড়েনা। মরে গেলেই কি আসে যায়! যখন সে মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন নিজেই থেমে যায়। একবার গাড়ী নষ্ট থাকায় আনিস সাহেবকে সি.এন.জি দিয়ে এক জায়গায় যেতে হয়েছিলো। সেখানে গিয়ে সি.এন.জি চালক ভাড়া ১০ টাকা বেশি চাওয়ায়ে তার সাথে আনিস সাহেব মারামারি শুরু করে দেন। বিচ্ছিরি অবস্থা! পরে মানুষজন এসে তাদেরকে থামায়। অনেকে চিনতে পারে আনিস সাহেবকে, আর এটা ভেবে অবাকও হয় যে উনার মতো মানুষের ১০ টাকা বেশি দিলে কি আসে যায়! কিন্তু কেউ কিছু বলে না বা বলার সাহস পায় না। তার অবস্থাটা এমন হয়েছে যে, যতো পায়-আরও চায়। নিজের সম্পদে সে সন্তুষ্ট না। সারাদিন সে চিন্তা করতে থাকে যে, কিভাবে এটা বাড়ানো যায়। তার দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত কবিতার লাইনগুলো মনে পরে- “এ জগতে হায়, সেই বেশি চায়, আছে যার ভুরি-ভুরি; রাজার হস্ত, করে সমস্ত, কাঙালের ধন চুরি”। জামাল তার স্বল্প জ্ঞানে বুঝতে পারে, এটাও এক ধরনের ক্ষুধা। যে ক্ষুধা সহজে মেটে না। কেবল বাড়তেই থাকে। এর নাম ‘অর্থ-ক্ষুধা’।

আনিস সাহেবের স্ত্রী, ‘মিসেস আনিস’।

সঙ্গত কারনে তার নামটা বলা হলো না। যাই হোক, তার কথা কিভাবে বলবো বুঝতে পারছি না। তবু বলতে হবে, না হলে ভদ্র, এবং অভিজাত সমাজের কিছু কর্মকাণ্ড মানুষের চোখের আড়ালেই রয়ে যাবে। মিসেস আনিসকে সরাসরি একজন ‘পতিতা’ বলবো। ঘরে স্বামী থাকা সত্ত্বেও তাকে এইরুপ সম্বোধন করতে বাধ্য হয়েছি। তবে, সমাজের উঁচু স্তরের মানুষ বলে তার এই ব্যাপারটা চাপা পড়ে রয়েছে। পড়ে থাকবে হয়তো এভাবেই।

আনিস সাহেবের কাছে তার সবকিছু হচ্ছে তার ‘সম্পদ’। সে এটাকে বাড়ানোর চিন্তায় সারাদিন ব্যাস্ত থাকে। স্ত্রী কি করলো না করলো তাতে তার কিছুই আসে যায় না। আর তার স্ত্রীও এই সুযোগটাই কাজে লাগান। সকালে দুজন একসাথেই বের হন। আনিস সাহেব চলে যান অফিসে আর তার স্ত্রী চলে যান ‘সোশ্যাল-এ্যাক্টিভিটি’ নামক কোনো এক ক্লাবে। যেই ক্লাবের মালিক মিসেস আনিস নিজেই। যাই হোক, মাঝে মধ্যেই বের হবার ১০ মিনিটের মাথায় বাসায় ফিরে আসেন মিসেস আনিস। আর প্রত্যেকবারই তার সাথে থাকে নতুন কোনো ভদ্রলোক। জামালকে তখন পাঠিয়ে দেয়া হয় বাজারে। বের হবার সময় পুরো ব্যাপারটা ধরতে জামালের বেশি বেগ পেতে হয় না। বাজারের ভিড়ে দাড়িয়ে জামাল নিজেকে প্রশ্ন করে- এগুলোর মানে কি? উনার তো কোন কিছুর অভাব নেই। না টাকার অভাব, না খাবারের অভাব, না কাপড়ের অভাব। তারপরও এমন কেনো? সমাজের সাধারন পতিতারা যেখানে নিজেদের পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য অভাবের তাড়নায় এই কাজে লিপ্ত, সেখানে মিসেস আনিসের মতো মহিলারা কোনো কিছুর অভাব না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র নিজেদের ফুর্তির জন্য এ ধরনের কাজে লিপ্ত। জামালের মাথায় আরও একটা প্রশ্ন প্রায়ই উঁকি দেয়- একই কাজ মিসেস আনিসও করছে, আবার রাস্তার একটা খারাপ মেয়েও করছে। রাস্তার মেয়েটাকে এই কাজের জন্য আলাদা একটা নামকরন করা হয়েছে অথচ মিসেস আনিসকে তা করা হয়নি। কেনো??? জামাল কোনো উত্তর খুজে পায় না। পাবে বলে মনেও হয় না। তাই সে হাল ছেড়ে দেয়। তবে এটুকু বুঝতে পারে যে, এটাও এক ধরনের ক্ষুধা। স্বামীর মতো অর্থের ক্ষুধা না থাকলেও মিসেস আনিসের ক্ষুধা কোন পর্যায়ের তা খুব ভালো করেই বুঝতে পারে জামাল, তার স্বল্প জ্ঞানে। ভদ্র সমাজে এর নাম ‘যৌন-ক্ষুধা’।

একসময় জামালের মনে হতো, পৃথিবীতে পেটের ক্ষুধার চেয়ে বড় কোনো ক্ষুধা নেই। থাকতেও পারে না। অথচ দিন দিন তার ধারনার পরিবর্তন হচ্ছে। কারন পেটের ক্ষুধার কথা সে চিন্তা করেছিলো নিজের দিকে তাকিয়ে। বাসার অন্য দুইজনের দিকে তাকিয়ে সে এখন বুঝতে পারছে যে আরও অনেক ধরনের ক্ষুধাই পৃথিবীতে রয়েছে। একই পরিবারের তিনটি মানুষ। অথচ তিনজনের ক্ষুধা তিনরকম। জামালের ক্ষুধা আর তাদের ক্ষুধার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। জামাল বুঝতে পারে ধনী- গরীবের পার্থক্যটা হয়তো এই ক্ষুধার কারনেই তৈরি হয়েছে। কি আজব এই দুনিয়া! ধনী- গরীবের ক্ষুধার মাঝেও রয়েছে পার্থক্য আর ক্ষুধার কারনে সৃষ্ট এই পার্থক্য এভাবেই হয়তো চলতে থাকবে, আজীবন। আরও একটা প্রশ্নের উত্তর জামাল ইদানীং খুজে বেড়ায়। তা হলো, আনিস সাহেব বা তার স্ত্রী যদি জামালের মতো পেটের দায়ে আঁটকা পড়তো তখনও কি তাদের মধ্যে এরকম ক্ষুধা থাকতো কিনা?

(বিঃ দ্রঃ- অনিচ্ছাসত্ত্বেও গল্পে এমন কিছু শব্দ ব্যাবহার করা হয়েছে যার কারনে পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আশা করি পাঠকরা পজিটিভলি নিবেন।)  

বর্ষার কান্না,হাঁসি……

31 জুল

unrain

 

আবার শুরু হলো বৃষ্টি। বর্ষাকালের এই এক প্রধান বৈশিষ্ট্য। বলা নেই-কওয়া নেই, হঠাৎ করেই বৃষ্টি শুরু। সকালেও আকাশটা পরিষ্কার ছিল। মেঘের নাম-গন্ধও ছিলো না । ভাবছিলাম, বের হবো ঠিক সেই মুহূর্তেই দুনিয়া কালো করে বৃষ্টিটা নামলো। সে কি বৃষ্টি! বাইরে কিছুই দেখা যায় না।

কি আর করা।

কিছুক্ষণ বাইরে চেয়ে থেকে জানালাটা বন্ধ করে দিলাম। খারাপ হয়ে গেল মেজাজটা।

আজ এক যায়গায় যাওয়ার কথা ছিলো। না গেলে বিরাট ঝামেলা হয়ে যাবে। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। যেই বৃষ্টি তাতে ছাতা নিয়েও বের হওয়া যাবে না।

শুধুমাত্র এই একটা কারনেই বর্ষা ঋতুটাকে আমার একদম ভাল লাগে না। বর্ষা মানেই বৃষ্টি। আর বৃষ্টি মানেই ঘর-বন্দি হয়ে থাকা। হুট-হাট করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। কোথাও বের হওয়া যায় না। রাস্তায় হাটুঁ পানি জমে যায়। ক্লাসেও যাওয়া যায় না। সারাটা দিন চুপচাপ ঘরে বসে থাকতে হয়। এর চেয়ে বিরক্তিকর কিছু কি আর আছে? আমি তেমন সাহিত্যিকও না যে, বৃষ্টির দিনে ঘরে বসে কবিতা বা গল্প লিখবো। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বর্ষা ঋতুটা না থাকলেই ভাল হতো। পাঁচটা ঋতুই যথেষ্ট। বৃষ্টি বাদলা হতো না। রাস্তা-ঘাঁট ঝকঝকে থাকতো। যখন ইচ্ছা ঘর থেকে বের হওয়া যেতো।

যা হোক, এসব কথা ভেবে কোন লাভ নেই। খাটের উপর বালিশে হেলান দিয়ে বসলাম। ঘড়িতে দেখলাম বিকাল ৪টা। অথচ বাইরে তাকালে মনে হয় সন্ধ্যা ৬টা বেজে গেছে। বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় রইলাম।

……………………

কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানিনা, হঠাৎ খুব পরিচিত একটা গলার শব্দে তন্দ্রা ভাবটা কেটে গেলো। উঠে বসলাম। দেখি, গনি চাচা আমার সামনে দাড়িয়ে আছেন। মুখে ম্লান হাঁসি।

গনি চাচা কখন এলো কিছুই টের পাইনি। যাই হোক, সালাম দিয়ে বললাম- কখন এলেন চাচা?

গনি চাচা বললেন- এইমাত্রই এলাম ভাতিজা। চলো, তোমারে নিয়া একটু বাইরে যাবো।

আমি শরীর ঝাড়া দিয়ে উঠে বললাম- ঠিক আছে চাচা, আপনি বাইরে অপেক্ষা করেন। আমি আসছি। বলে বাথরুমে গেলাম হাথ-মুখ ধুতে।

বাথরুম থেকে বের হবার সময় ভাবছিলাম, গনি চাচার কথা। আমরা গ্রামের বাড়িতে গেলে উনিই সবার আগে দৌড়ে আসেন আমাদের খোঁজ নিতে। আমার দাদার সাথে উনার বাবার খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। সে সুত্রেই তাকে আমরা চাচা ডাকি। খুবই ভালো মানুষ গনি চাচা। যত বিপদ-আপদ বা ঝামেলাই হোক না কেনো, তার মুখে সবসময় একগাল হাঁসি লেগেই থাকে। আমি গ্রামে এলে উনার সাথেই বেশিরভাগ সময় ঘুরে বেরাই। নৌকায় ঘুরতে আমি খুব পছন্দ করি। তাই গ্রামে এলেই গনি চাচা আমার জন্য একটা নৌকা ঠিক করে রাখেন আর বিকেলে নিজেই আমাকে নৌকায় বসিয়ে দাঁড় টানেন। আমার চেয়ে বয়সে দ্বিগুণ হলেও গনি চাচা আমার সাথে সম্পূর্ণ অন্যরকম। পারিবারিক সমস্ত ঝুঁট-ঝামেলার কথা তিনি আমাকে বলেন। সমস্যায়ে পরলে সমাধানের উপায় জানতে চান। আমিও তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করি। গনি চাচা পেশায় একজন কৃষক। তার আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। মানুষের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। তাতে তেমন লাভ হয়না। স্ত্রী আর ৫ বছরের একটা ছেলেকে নিয়ে খুব অসহায় দিন কাটান তিনি। মাঝে-মধ্যে দুই-একবেলা না খেয়ে থাকলেও কখনো কারো কাছ থেকে তিনি করুনা নিতেন না। আমি মাঝে মাঝে তাকে টাকা-পয়সা সাধলেও কখনই তিনি তা গ্রহন করেন নি। পাঁথরের মতো একটা মানুষ।

যাই হোক, এসব ভাবতে ভাবতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। গনি চাঁচাকে জিজ্ঞেস করলাম- কোথায় যাবেন চাঁচা?

উনি একগাল হেঁসে বললেন- চলো, তোমাকে একটা জিনিষ দেখিয়ে আনি।

দুজন হাঁটতে শুরু করলাম। আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি কখন থামলো বুঝলাম না। গ্রামের একমাত্র প্রাইমারী স্কুলটার সামনে দিয়ে যাবার সময় লক্ষ করলাম স্কুলের মাঠটা ফেটে একেবারে চৌচির। বর্ষাকালেও মাঠের এই অবস্থা কেনো, বুঝলাম না। হাঁটতে হাঁটতে এরকম আরও কয়েকটা মাঠ আর ফসলের ক্ষেত চোখে পড়লো। সবগুলোর একই অবস্থা। খুব অবাক হচ্ছিলাম।

ব্যাপার কি? এখানে কি বৃষ্টি হয়নি নাকি?

গনি চাচাকে জিজ্ঞেস করতে যাবো ওমনি হঠাৎ একটা পাঁথরেরে সাথে হোঁচট খেলেন গনি চাচা। আমি তাকে সামলে নিয়ে বললাম- কি ব্যাপার চাচা? কোন সমস্যা?

গনি চাচা মুখে সেই ম্লান হাঁসি রেখেই বললেন- একটু চিন্তার মধ্যে আছি তো ভাতিজা, তাই পাথরটা খেয়াল করি নাই।

আমি বললাম- কি চিন্তা, আমাকে বলেন চাচা?

গনি চাচা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন- চলো, দেখবা।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা গনি চাচার বাসার সামনে চলে এলাম। খুব ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর। আগেও এসেছি। গনি চাচার সাথে ভিতরে ঢুকলাম। ঘরের অবস্থা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। হাতেগোনা কয়েকটা আসবাবপত্র। আগে আরও ছিলো। বুঝলাম, ওগুলো হয়তো বিক্রি হয়ে গেছে কোন কারনে।

চাচার স্ত্রী-কে দেখলাম বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ঘরের এক কোনে বসে আছে। মুখটা ফ্যাঁকাসে। বাচ্চাটার মুখটাও ফ্যাঁকাসে। সন্দেহ হলো। সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- কি হয়েছে চাচী?

চাচী কান্না জড়ানো কণ্ঠে বললেন- কিসু বুঝতাসিনা বাবা। মুন্না কয়দিন ধইরাই কিসু খাইতাসে না। সব বমি কইরা দেয়।

আমি সামনে যেয়ে ভালো করে দেখলাম। চোখগুলো পুরো হলুদ হয়ে গেছে বাচ্চাটার। হাতের নখেরও একই অবস্থা। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, জণ্ডিস।

কয়দিন ধরে এরকম- জিজ্ঞেস করলাম।

গনি চাচা বললেন- প্রায় হপ্তা তিনেক।

শুনে আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করলো। বললাম- ওর তো জণ্ডিস হয়েছে! এতদিন হয়ে গেছে আপনারা ডাক্তার দেখান নাই কেনো? অবস্থা তো অনেক খারাপ!

গনি চাঁচা তখন মাথা নামিয়ে বললেন- টাকা কই পামু ভাতিজা? এই বছর বর্ষায় তেমন একটা বৃষ্টি হয় নাই। অনাবৃষ্টির কারনে ক্ষেতে এবার একটাও ফসল ফলে নাই। ঘরের থালা-বাসন, চেয়ার,যা আসিলো বিক্রি কইরা এতদিন খাইসি। ওরে ডাক্তার দেখানোর পয়সা কই পামু?

আমার তখন মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। বললাম- নিজের জন্য না হোক, অন্তত এই বাচ্চাটার জন্য আপনি আমার কাছে বলতে পারতেন। কাজটা ঠিক করেন নাই চাচা।

এতদিন ধরে বাচ্ছা ছেলেটা বিনা চিকিৎসায়ে জণ্ডিসের সাথে লড়াই করে আসছে! আর দেরি করা ঠিক হবে না। অবশ্য আমার মনে হচ্ছিলো, এমনিতেও অনেক দেরি হয়ে গেছে। যাই হোক, আর কথা বাড়ালাম না। চাচাকে জলদি একটা ভ্যান আনতে বললাম। এক্ষুনি ওকে হাঁসপাতালে নিতে হবে। জণ্ডিস প্রকট আকার ধারন করেছে।

মিনিট-পাঁচেক পর গনি চাচা একটা ভ্যান নিয়ে এলেন। বাচ্চাটাকে ভ্যানে তুলে আমরা সদরের দিকে রওনা দিলাম।

পথে গনি চাচা বলতে লাগলেন, এবারের বর্ষায়ে নাকি তেমন বৃষ্টি হয়নি। অনাবৃষ্টির কারনে অনেক কৃষক পথে বসেছে। কেউ কেউ তার সর্বস্ব বিক্রি করে ঢাকায় গিয়ে ভিক্ষা করছে। আল্লাহ্‌র গজব নেমেছে দেশে।

আমি তখন চুপ করে ছিলাম। বলার মতো কিছু খুজে পাচ্ছিলাম না। শুধু উপলব্ধি করছিলাম; এই বর্ষাকাল, বৃষ্টি, কিছু মানুষদের জন্য কতো দরকারি একটা জিনিষ! সামান্য বৃষ্টির কারনে কতোগুলো পরিবার পথে বসেছে, সর্বস্ব খুইয়েছে, কেউবা নিজের ছেলের জীবন বাঁচাতে দৌরাচ্ছে। ঢাকায় চার দেয়ালের ভিতরে থেকে কখনো ভেবেও দেখিনি যে, -এরকমও হতে পারে। নিজের কিছু স্বার্থের কারনে কিছুক্ষন আগে আমি নিজেই ‘বর্ষার’ ঘোর বিরোধিতা করছিলাম। ভাবছিলাম, এই ঋতুটা না থাকলেই ভালো হতো। রাস্তা-ঘাঁট পরিষ্কার থাকতো, বাইরে বের হতে ঝামেলা হতো না। অথচ, এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি ‘বর্ষার’ তাৎপর্য। বর্ষার প্রয়োজনীয়তা।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকালাম। নিষ্পাপ একটা শিশু। কোন দোষ নেই। অথচ অনাবৃষ্টির কারনে ওর বাবা ওর চিকিৎসার  টাকা যোগার করতে পারেনি বলে আজ এই বাচ্চাটাকে মৃত্যুর সাথে লড়তে হচ্ছে।

কান্না চলে এলো। তখনও আরও ১০ মিনিটের মত রাস্তা বাকি। গনি চাচা ভ্যান চালককে তাড়া দিচ্ছিলেন জোড়ে চালানোর জন্য। বাচ্চাটা কিছুক্ষন পর পর বড় করে শ্বাস নিচ্ছে। ঠোঁটগুলো বরফের মতো সাদা হয়ে গেছে। হাত পায়ের তলা ঠাণ্ডা। ভ্যান যথেষ্ট দ্রুতই চলছিলো কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো আরও দ্রুত চালাতে হবে। সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। গনি চাচা ওর হাত পায়ের তলা ঘষছিলেন। আমি ওর মুখের সামনে পানির বোতলটা ধরলাম। বাচ্চাটা মুখ খুললো না। কিছুক্ষন পর মাথাটা একদিকে ঢলে পড়লো।

হাতের নাড়ি পরীক্ষা করলাম। নাহ্…নেই।

মারা গেছে বাচ্চাটা।

গনি চাঁচা অনেক্ষন ‘মুন্না’ ‘মুন্না’ করে ডাকলেন। কোন লাভ হলো না। আমার দু’চোখ ফেটে বেরিয়ে এলো পানি। কোনোভাবেই চেপে রাখতে পারলাম না কান্না। ভ্যান-ওয়ালাকে ভ্যান ঘুরিয়ে ফেলতে বললাম। এদিকে টিপটিপ বৃষ্টির ফোঁটা পরতে শুরু করলো। সাথে ঝড়ো-বাতাস। মনে হচ্ছিলো, প্রকৃতিও মেনে নিতে পারছে না বাচ্চাটার মৃত্যু। তাই আমাদের সাথে যোগ দিতে নেমে এসেছে,বৃষ্টি হয়ে।

কিছুক্ষনের মধ্যে বৃষ্টির তেজ অনেক বেড়ে গেলো। প্রকৃতিও আমাদের সাথে কাঁদলো তার সমস্ত অন্তর দিয়ে। সবকিছু উপেক্ষা করে তবু চলছিলাম আমরা তিনজন। সাথে মুন্না। গনি চাচার চোখের পানি বৃষ্টির পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিলো। আলাদা করতে পারছিলাম না কোনটা বৃষ্টির ফোঁটা, কোনটা চোখের পানি। তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। হঠাৎ মনে হলো, মুন্না যেনো আমার ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলটা খামছে ধরলো……

——-কড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড় …ড়ড়ড়ম—–

প্রচণ্ড জোড়ে বাঁজ পড়লো আশে-পাশে কোথাও। ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। উঠে দেখি বিকাল ৫টা। বৃষ্টি এখনও থামেনি। আব্বাকে ফোন দিলাম। আব্বা গতকাল গ্রামের বাড়িতে গেছেন জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে কিনা? আব্বা বললেন ওখানে নাকি গত দুই দিন যাবৎ টানা বৃষ্টি। সবার জমিতে ফলন কেমন- জিজ্ঞেস করাতে আব্বা কিছুটা অবাক হলেন। বললেন- ফলন এবার ভালই হয়েছে। তুই হঠাৎ এসব কথা জিজ্ঞেস করছিস? আমি কিছু বললাম না। পাশে তখন গনি চাঁচার গলা শুনতে পেলাম। আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন- ভাতিজা, এবার বাম্পার ফলন। আইসা পরো গ্রামে। নৌকায় ঘুরামু।

ফোন কেটে দিলাম। বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গেছে। বাইরে যেতে হবে।

বের হবার সময় ভাবছিলাম,একটু আগে দেখা স্বপ্নটার কথা। ব্যাপারটা স্বপ্ন হলেও যথেষ্ট বাস্তবতা ছিলো সেখানে। বিশেষ করে শেষের দিকটায় সত্যিই আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। যাই হোক, বেরিয়ে দেখি রাস্তায় হাঁটু-পানি। বর্ষার অতি পরিচিত রুপ। সব কিছুরই যেমন ভালো দিক আছে, তেমন খারাপ দিকও আছে। নির্ভর করে নিজের উপর যে, আমি কোনটা গ্রহন করবো। ভালো দিকটা, নাকি খারাপ দিকটা।

রাস্তার এ অবস্থা দেখে মনে মনে কিছুটা রাগ হলাম ঠিকই কিন্তু পরক্ষনে প্যান্ট গুঁটিয়ে হাঁটা ধরলাম। মেনে নিলাম হাঁসি মুখে।

অসংজ্ঞায়িত…

24 জুল

yousufkhan007_1326995381_1-ree

খাতা কলম নিয়ে বসলাম ঠিকই কিন্তু কি যে লিখবো, ভেবে পাচ্ছিলাম না। বন্ধু-বিষয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছা করছিলো। আমি অবশ্য বরাবরই গম্ভীর স্বভাবের মানুষ ছিলাম। বন্ধু-বান্ধব তেমন একটা নেই। কিভাবে লিখবো ‘বন্ধু’ নিয়ে? যাই হোক, অনেক ভেবে-চিন্তে শুরু করলাম খুব সাধারন একটা ঘটনা-

আজ থেকে প্রায় ৮ বছর আগের কথা। তখন ক্লাস ফাইভ-এ পড়ি। এটা আগেই বলেছি যে, ছোটবেলা থেকেই আমি গম্ভীর স্বভাবের ছিলাম। সবার সাথে তেমন একটা কথা বলতাম না। স্কুলেও কারো সাথে মিশতাম না। নিজের মত থাকতাম। স্কুল যেতাম, স্কুল থেকে বাসায় এসে সারাদিন চুপচাপ ঘরে বসে থাকতাম। খেলাধুলাও করতাম না। আব্বু-আম্মু এজন্য আমার উপর অনেক রাগ করতেন। আম্মুর ধারনা, এভাবে আর কিছুদিন থাকলে আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পরবো। আমারও তাই মনে হচ্ছিলো। মোট কথা, বন্ধুহীন, সঙ্গীহীন খুব খারাপ একটা সময় কাটছিল আমার।

এমন সময় একদিন ‘শাহজাহান’ নামে আমার এক দূর সম্পর্কের চাচার সাথে ‘ও’ এলো। চাচার নামটা আমি দ্রুত উচ্ছারন করতে যেয়ে ‘সাজাহান’ বানিয়ে ফেলতাম। আমার কাছে তিনি এখনো ‘সাজাহান’-ই রয়ে গেছেন। যাই হোক, ‘ও’ ছিল অনাথ। বাবা-মা নেই। আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। আব্বু ওর জন্য ছাদে খুব সুন্দর একটা ঘর ঠিক করে রেখেছিলেন। সারাদিন ওখানেই থাকতো। শুধু খাবার সময় হলে নিচে নেমে আসতো। বাসার সবাই ‘ও’কে খুব পছন্দ করতো। আর ও আসার পর থেকেই শুরু হলো আমার পরিবর্তন।

বিকেল হলেই ছাদে যেয়ে ‘ও’র সাথে সময় কাটাতাম। খেলাধুলা করতাম। যেদিন স্কুল বন্ধ থাকতো সেদিন সারাটা দিনই ‘ও’র সাথে থাকতাম। বুড়িগঙ্গার পারে নতুন রাস্তাটায় দুজন একসাথে দৌড়তাম। আমার সাথেই ‘ও’র ঘনিষ্টতা ছিলো সবচেয়ে বেশি। বাসার অন্য কার সাথে ‘ও’ তেমন একটা মিশতো না। কাছেও যেত না। একবার ‘ও’র কি যেনো একটা রোগ হলো। সারাদিন শরীর চুলকাত। আমি ভাবলাম বুঝি ‘এলার্জি’।                                                                                                  কিন্তু না,অন্য কোন রোগ। নিজেই নিয়ে গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার কি যেন একটা ওষুধ দিয়ে বললো পানিতে মিশিয়ে গোসল করালে সেরে যাবে। আমি তা-ই করলাম। কয়েকদিনের মধ্যে রোগ সেরে গেলো।

‘ও’ আমার সব কথাই শুনতো। যখন যেটা বলতাম। মুরুব্বিদেরকে ‘ও’ খুব সম্মান করতো। এই গুনটা আমি ‘ও’র খুব ভালো করেই লক্ষ করেছিলাম। একবার একটা ঘটনা ঘটেছিলো তাতে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। আমরা পুরান ঢাকার অধিবাসী। পুরান ঢাকায় যাদের বাড়ী আছে তারা খুব ভালো করেই জানেন এখানে বানরের প্রচণ্ড উৎপাত। আগে এর জন্য ছাঁদে উঠতেই ভয় পেতাম। তবে ‘ও’ আসার পর থেকে ভয়টা অনেক কমে গিয়েছিলো। বানর আসলে দুজন একসাথে তারা করতাম। একদিন, কি কাজে যেন আমি বাইরে গিয়েছিলাম। বাসায় ঢুকেই শুনি ছাদে অনেকগুলো কাক একসাথে কা-কা করছে। লক্ষন সুবিধার মনে হোল না। দৌরে ছাদে গেলাম। গিয়ে দেখি প্রায় ১০/১২ টা বানর ‘ও’-কে ঘিরে বসে আছে। তবে ‘ও’ ভয় পাচ্ছে বলে মনে হোল না। প্রচণ্ড সাহসি ছিলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় যেই বানরটা সেটাকে মনে হোল কোন আক্রমন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি কোন কিছু চিন্তা না করেই একটা লাঠি নিয়ে সোজা দৌরে গেলাম সামনে। আমাকে তেড়ে আসতে দেখেই বানরগুলো সব সরে পড়লো। আর ‘ও’ যেন আমাকে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সেদিন সত্যিই খুব ভয় পেয়েছিলাম। ‘ও’র কিছু হয়ে গেলে সত্যিই খুব কষ্ট পেতাম। কারন ‘ও’ ছিল আমার একমাত্র খেলার সাথি। একমাত্র বন্ধু।

স্কুলের অনেক ছেলেরাই ‘ও’র কারনে আমার সাথে হিংসা করতো। স্বাভাবিক। ওদের কারোরই এরকম কোন বন্ধু ছিল না। আর আমার বন্ধুটাও ছিল হিংসা করার মত। বেশ লম্বা। গায়ের রঙ ঝকঝকে। উজ্জ্বল একজোরা চোখ। সব মিলিয়ে ‘ও’কে খুবই সুন্দর লাগতো। যে কেউই ‘ও’র সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকতো।

আমার দাদী একবার কি কারনে যেন বললেন, ‘ও’র আর এখানে থাকার দরকার নেই। অনেক হয়েছে। শাহজাহানকে বলে ‘ও’কে বিদেয় করে দাও।

দাদীর এই আচমকা সিদ্ধান্তের কোন কারন আমি খুঁজে পেলাম না। কিছু জিজ্ঞেস করারও সাহস পেলাম না। পুরো দিনটাই সেদিন না খেয়ে রইলাম। এক গ্লাস পানিও খেলাম না তবে, আব্বু-আম্মুকে সেটা বুঝতে দিলাম না। জানি, দাদীর হুকুমের কোন নড়চড় হবে না।

যেদিন ‘ও’ চলে যাবে, সেদিন দুপুরে ছাদে বসে অনেকক্ষণ ওর সাথে চোখের ভাষায় কথা বললাম। বুঝিয়ে দিলাম, আমি প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছি, ‘ও’ চলে যাবে বলে। ‘ও’র ও একই অবস্থা। বুঝলাম, আমাকে ছেড়ে যেতে ‘ও’র ও অনেক কষ্ট হচ্ছে। চোখ দিয়ে সমানে পানি পরছে। আমি চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারলাম না।

সন্ধ্যার দিকে এলো ‘সাজাহান’ চাচা। অনেকটা জোড়-জবরদস্তি করেই নিয়ে গেলো ‘ও’কে। আমি চুপচাপ দাড়িয়ে ‘ও’র চলে যাওয়া দেখলাম। কিছুই করতে পারলাম না। এই ঘটনার পর আমি আবার আগের মত হয়ে গেলাম। সারাদিন চুপচাপ নিজের ঘরে বসে রইলাম। একবারের জন্যও বের হলাম না। দুইটা দিন এভাবেই কেটে গেলো।

পরদিন সন্ধ্যায় ঘরে বসে টিভি দেখছি, হঠাৎ শুনলাম নিচে কার যেন শব্দ। পরিচিত লাগলো। দরজা খুলে দৌড়ে নিচে গেলাম। যা ভেবেছিলাম তাই। ‘ও’ ফিরে এসেছে। কিন্তু কিভাবে এলো, বুঝলাম না। তখন এতকিছু চিন্তা না করে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম আমার খেলার সাথিটাকে। জানি, ‘ও’ কোন উত্তর দিবেনা বা দিলেও আমি বুঝব না, তারপরও জিজ্ঞেস করলাম- কিভাবে এতদুর থেকে চলে এলি? বাসা খুঁজে পেলি কিভাবে? ‘ও’ কোন উত্তর দিলো না। শুধু আমার সামনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলো। আমিও আর কথা না বাড়িয়ে ‘ও’কে উপরে নিয়ে গেলাম। আব্বু,আম্মু, দাদী সবাই তো ওকে দেখে অবাক! তবে কেউ কিছু বললো না। দাদিও না। হয়ত আমার প্রতি ‘ও’র ভালোবাসার যে গভীর টান, দাদীও সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। দাদীই তখন ‘ও’কে খাবার এনে দিলেন। খুব ক্ষুধার্ত ছিলো। সব খাবার একবারেই খেয়ে ফেললো। খাবার পর আমি ‘ও’কে ছাঁদে নিয়ে গেলাম। ‘ও’র ঘরে। বেশ কিছুক্ষন থেকে নিচে নেমে আসলাম।

‘ও’ ফিরে আসার পর আমি আবারও চঞ্চল হয়ে উঠলাম। সারাদিন খেলাধুলায় ব্যাস্ত থাকতাম। মোট কথা, সঙ্গীহীন একঘেয়ে জীবনটা থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম। খুব ভালভাবেই দিনগুলি কাটছিলো। দুজন একসাথেই বেড়ে উঠতে লাগলাম।

এভাবে কেটে গেলো পাঁচটা বছর। ওদিকে আমার পড়াশুনার ব্যাস্ততাও বাড়তে লাগলো। এস.এস.সি পরীক্ষা চলে এলো সামনে। দুইবেলা করে স্যার আসতেন। ‘ও’র সাথে সময় কাটাতাম খুবই কম। ‘ও’ হয়ত এই কারনে আমার উপরে কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে থাকলো। আমি ব্যাপারটা বুঝলাম। কিছু পরিবর্তনও লক্ষ করলাম ‘ও’র মধ্যে। সামনে গেলে কেমন যেন অন্যরকম আচরন করতো। আগের মতো খেলা-ধুলাও করতে পছন্দ করতো না। দৌড়া-দৌড়িও করতো না। আমি ভাবলাম, অসুস্থ হয়ে পরেছে বোধহয়। পড়াশুনার কারনে অনেকদিন যাবত খেলা হয়নি, তাই হয়তো ঝিমিয়ে পড়েছে।

কিন্তু না। তেমন কিছু না। ব্যাপারটা ছিল অন্যরকম। পরে বুঝতে পারলাম, ‘ও’র হয়তো মানসিক কোন সমস্যা হচ্ছে। এক ধরনের বিপর্যয় ঘটতে শুরু করেছে। আব্বু ব্যাপারটা খেয়াল করলেন। আমি খেয়াল করলেও ব্যাপারটা বুঝতে চাইছিলাম না। মনে একধরনের চাপা আতংক অনুভব করছিলাম। আস্তে আস্তে বাসার সবাই ব্যাপারটা টের পেলো। একদিন তো আমাদের কাজের বুয়ার ছোট্ট ছেলেটার সাথে রক্তা-রক্তি কাণ্ড করে বসলো। এভাবে বেশিদিন চললে সমস্যা আরও বড় হবে। আব্বুকে দেখলাম বেশ চিন্তিত। হয়তো কোন সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। সেদিনই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।

পরদিন সকালে দুজন লোক এলো বাসায়। বুঝলাম,এরা কারা। ঠিক সেইদিনের মতই জোড়-জবরদস্তি করে ‘ও’কে নিয়ে গেলো লোকগুলো। আমিও ঠিক সেইদিনের মতো দাড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলাম না। কোথায় নিয়ে গেল, জানতেও পারলাম না। সেদিন আমি কোনোভাবেই কান্না চেপে রাখতে পারিনি। আজও সেদিনের কথা মনে পরলে আমার প্রচণ্ড কান্না পায়। বুকে এক ধরনের ব্যাথা অনুভব হয়। যে ব্যাথার কোন উপশম নেই। কোন সংজ্ঞা নেই। সেদিন যে লোকগুলো ওকে নিতে এসেছিলো ওরা ছিল ‘মিউনিসিপ্যাঁলটি’র লোক। বয়সের কারনে আমার বন্ধু ‘টাইগার’ (প্রচণ্ড সাহসের কারনে ওকে আমি এই নামে ডাকতাম –একটা কুকুর) মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলো। বুয়ার ছেলেটার পায়ে সেদিন ‘ও’ কামড় দিয়ে রক্ত বের করে ফেলেছিলো। তাই আব্বু খুব দ্রুতই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে নাকি কুকুরদের এই সমস্যাটা দেখা দেয়। তখন ওরা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। পাগলের মতো হয়ে যায়। তখন নাকি ওদেরকে মেরে ফেলা ছাড়া কোন গতি থাকে না। কতটুকু সত্যি,জানি না তবে, ‘ও’ যেদিন চলে গেলো সেদিন রাতে আমার প্রচণ্ড জ্বর এলো। জ্বরের মধ্যে নাকি প্রলাপও বকেছিলাম, আর সেই প্রলাপের মূলে ছিল ‘টাইগার’, আমার ‘বন্ধু’।

সেই জ্বরে আমি অনেকদিন ভুগেছিলাম। এখনো সেই মারাত্মক জ্বরের কথা মনে আছে আমার। আজ এত বছর পর আমি ‘ও’র কথাগুলো লিখছি, জানি ‘ও’ বেঁচে নেই কিন্তু, কেনও জানি মন মানতে চায় না। মনে হয়, ‘ও’ এখনো বেঁচে আছে। নিজের সবচাইতে ঘনিষ্ট বন্ধু, সর্বপ্রথম খেলার সাথিটাকে ভুলতে অনেক কষ্ট হয়। পারি না। এখনও নদীর পারের রাস্তাটায় হাঁটতে গেলে মনে হয়, ‘ও’ আমার পাশে পাশে হাঁটছে। করুন চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখের কোন বেয়ে ঝরে পড়ছে অশ্রু।

এই ছিল ‘ও’র গল্প। ‘টাইগারের’ গল্প। আমি আমার পুরো গল্পটায় একটা ‘কুকুর’-কে ‘ও’ বলে সম্বোধন করেছি। কেনো করেছি,জানি না। শুধু জানি, এই কুকুরটাই ছিলো আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু, আমার প্রথম খেলার সাথি। জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা মুহূর্তে সে এসে দাড়িয়েছিলো আমার পাশে। আমাকে দিয়েছিলো সঙ্গ। যেটার আমার সবচেয়ে বেশি দরকার ছিলো তখন। জানিনা ‘ও’র জায়গায় কোন মানুষ থাকলে কি হতো বা আদৌ তার কোন ভুমিকা থাকতো কিনা। তবে ‘টাইগার’ যে ভুমিকা পালন করেছে সেটা আমার কাছে অদ্বিতীয়। জীবনে কোনদিন ভুলবো না সে ভুমিকা। ভোলা যাবেও না। জানিনা এটা বলা ঠিক হবে কিনা, তবে আমার কাছে মনে হয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘পশুরা’ মানুষকেও ছাড়িয়ে যায়। যে জায়গাগুলো হয়তো দখল করার কথা ছিলো কোন মানুষের; সেই জায়গাগুলো কিছু ‘পশু’ দখল করে নেয় খুব সহজেই, জায়গা করে নেয় মনের গহীন কোনে, শুধুমাত্র তাদের কয়েকটা গুনের কারনে। আর এতগুলো গুন নিয়েও কিছু কিছু মানুষ হয়- পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট। তাই সম্বোধনের ব্যাপারটা আমার কাছে মূল্যহীন। যাক, ও কথা হয়তো হবে অন্য কোন সময়। আজ আর নয়। মনটা আবারো খারাপ হয়ে গেলো আজকে। আর হয়তো লিখবো না ‘ও’কে নিয়ে। আর এখানেই শেষ হয় ‘ও’র গল্প। আমার বন্ধুর গল্প

ডিজিটাল ‘ফুলের’ দোকান

10 মে

গত কয়েকদিন আগের ঘটে যাওয়া একটা মজার এবং আকাশকুসুম চিন্তাভাবনার একটা ঘটনা বলি। আমি আর আমার এক বন্ধু গিয়েছিলাম শাহবাগ । বন্ধুর মামাতো বোনের বিয়ে, তাই ফুল কিনতে গিয়েছিলাম। অনেকগুলো দোকান ঘুরেও মন মত ফুল পেলাম না। ফুলটা হল ‘গোলাপ’ !!!আপনারা নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন যে ‘গোলাপ’ আবার না পাওয়ার কি আছে? সব দোকানেই তো পাওয়া যায়! আসল কথা হল আমরা চাইছিলাম কলি-গলাপ,যেটা পুরোপুরি এখনও ফোটেনি।ছোট অবস্থায়ে রয়েছে। সেই কলি-গোলাপ খুজতে খুজতে মগজ-ধোলাই হয়ে গেলো,তারপরও সেটা পেলাম না। হাল ছেড়ে দিয়ে বুড়া-গোলাপ কিনলাম কয়েকটা। ফুলের দোকানে দাড়িয়ে থাকতে থাকতে তখনি মাথায়ে চিন্তাটা এলো। বন্ধুর সাথে শেয়ার করলাম ব্যাপারটা। আমার আইডিয়াটা ছিল এরকম – এখনকার বাংলাদেশ হল ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’।

সবকিছুই হতে হবে ডিজিটাল। ফুলের দোকানটাও যদি হয় ডিজিটাল!!!কেমন হবে?সেটা কিভাবে??? ফুলের দোকানগুলোতে তখন আর ফুটন্ত ফুল থাকবে না। থাকবে শুধু ফুলের কলি।সেটা একটা হিমাগার এ রাখা হবে।যখন কোন কাস্টমার ফুল কিনতে আসবে তখন সে হিমাগার থেকে চয়েস করবে এবং তখনি হিমাগার এর ভিতরে সেটা কৃত্তিম উপায়ে ফোটানো হবে, হিমাগার এর ভিতরে কৃত্তিম আলো-বাতাস দিয়ে ফুলটাকে কাস্টমার এর চয়েস অনুযায়ী শেপ্ এ আনা হবে।তারপর সেটা হিমাগার থেকে বের করে কাস্টমারকে কে দেয়া হবে।সেটাই হবে ডিজিটাল ফুলের দোকান। বন্ধুরা অবশ্য ব্যাপারটা নিয়ে অনেক হাসাহাসি করেছে তবে আমি চিন্তা করছিলাম,প্রযুক্তি এখন অনেক উন্নত!!!এমন অনেক কিছুই এখন হচ্ছে যা আগে মানুষ কখনও কল্পনাও করেনি।অদূর ভবিষ্যতে এরকম কিছু হয়ত হতেও পারে!আমি ভাই কল্পনাবিলাসী মানুষ। আমার মাথায়ে এরকম অনেক চিন্তাই দিন রাত ঘুরতে থাকে। গত কয়েকদিন ধরেই ব্যাপারটা মাথায় ঘুরছিলো তাই লিখে ফেললাম। আপনারা অনেকেই হয়ত আমার এই লেখা পড়ে হাসবেন। হাসেন,কোন প্রবলেম নাই তবে দয়া করে আমার ফেইসবুক প্রোফাইল এ গিয়ে একবার ‘about me’ অংশ টা দেখে নিবেন।আমার সম্পর্কে আমি শুধু দুইটা কথাই লিখেছি। আমার এরূপ চিন্তা-ভাবনার উত্তর পাবেন আশা করি।

ইউসুফ খান(মাকুমাযান)

‘ও’….

5 মে

erer

 

মাঝে-মধ্যে যখন অলসভাবে বসে থাকি,এমন সব ঘটনার কথা মনে পড়ে যেগুলো ব্যাক্ত না করা পর্যন্ত শান্তি পাই না। কিছুদিন ধরেই একটা ঘটনার কথা খুব মনে পরছে। তাই লিখতে বসলাম।

আমার স্কুল জীবনটা ছিল খুব মজার। পড়াশুনায় তেমন একটা সিরিয়াস ছিলাম না, তাই বেশিরভাগ সময়  আড্ডা-হাসিতেই কাটত। ক্লাস এইট পর্যন্ত আমাদের সবার মধ্যে স্কুল-ছাত্র বলতে যে ভাবটা বোঝায়,সেই ভাবটাই ছিল। নাইনেও তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি তবে ক্লাস টেইন-এ ওঠামাত্রই শুরু হল পরিবর্তন।

সে কি অবস্থা! ক্লাসের গুন্ডা গোছের ছেলেগুলো কারন ছাড়াই ধুম-ধাম মারামারি শুরু করে দিতো আর গোবেচারা ছেলেগুলো মুখ বুজে মার খেত। আমি কখনও এসবের মধ্যে যেতাম না, তবে গোবেচারা ছেলেগুলোকে মার খেতে দেখে খুব কষ্ট লাগতো। স্কুলে মোটামুটি ভালই সময় কাটত। যদিও স্কুলে আমি একদমই যেতাম না। যেই ক’টা দিন বাধ্য হয়ে যেতাম,বসে বসে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করতাম আর ইচ্ছামত স্যারদের কাছে মার খেতাম। বেশিরভাগ সময় স্কুল গ্যাপ দেয়ার জন্যই মারটা খেতাম। আমার স্কুল গ্যাপ দেয়ার ছোট্ট একটা উদাহরন দেই; ক্লাস এইটে তখন আমি। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার ফল বের হল। আমি খুব ভালো না করলেও খারাপ করিনি। আমাদের ক্লাস টিচার ননীবাবু আমার যাবতীয় সব রেকর্ড রাখতেন। তার কারন হল আমার সেজো চাচা। সেজো চাচা আমাদের স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন এবং সেও ননীবাবু স্যারের ছাত্র ছিলেন। এমনকি আমার আব্বা আর বড় চাচাও। আমাদের স্কুলটা অনেক আগের। ১৮৬৬ সালে স্থাপিত। তো, আব্বা-চাচাদের আমলের কিছু স্যারকে আমরাও ভাগ্যজোরে পেয়েছিলাম। ননীবাবু স্যার তাদের মধ্যেই একজন। যাই হোক, সেদিন ক্লাসে রোল-কল করার সময় স্যার আমাকে দাড় করালেন। সব ছাত্ররা হা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। সম্ভবত চেনা-অচেনা দুই ধরনের মিস্র প্রতিক্রিয়া কাজ করছিল ওদের মধ্যে।

স্যার বললেন- রেজাল্ট কার্ডের উল্টোদিকটা দ্যাখ তো…                                                                                                       দেখলাম।

ক্লাসের মোট কার্যদিবস কতদিন? – স্যার বজ্র কণ্ঠে বললেন।

আমি আসলে এতক্ষণ জিনিসটা খেয়ালই করিনি। এবার সত্যিই বাড়াবাড়ি রকমের গ্যাপ দিয়ে ফেলেছি। স্কুলের মোট কার্যদিবস ৫৮ দিন, আর আমার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৮ দিন। কি বলবো খুজে পেলাম না। বোকার মত দাড়িয়ে সবার হাসি দেখছিলাম। যাই হোক, সেদিন ননীবাবু স্যার ছিলেন বলে বেঁচে গিয়েছিলাম। অন্য যেকোনো স্যার থাকলে নিশ্চিত পিটিয়ে আমাকে তুলো-ধুনো করত।

আরেকজন স্যারের কথা মনে পরে। তার নাম প্রকাশবাবু। আমাদের স্কুলের সবচাইতে জনপ্রিয় স্যার। আড়ালে অনেক ছাত্ররাই তাকে ‘বন্ধু’ বলে ডাকতো। ছাত্রদের প্রতি তার বন্ধুসুলভ ব্যাবহারের কারনে। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের স্কুলের বেশিরভাগ স্যারই ছিল গরু-পিটানো স্যার। হাতেগোনা কয়েকটা স্যার বাদে বাকি সবগুলো স্যার ছাত্রদেরকে গরুর মত পেটাতো। স্কুলে না আসার এটাই ছিল আমার মূল কারন। যেদিন যেতাম,প্রতিটা মুহূর্ত আমার আতঙ্কে কাটতো। মনে হতো স্কুলটা একটা আতঙ্কের জগত। এই আতঙ্কের জগতে প্রকাশ স্যার ছিলেন একমাত্র ব্যাক্তি যিনি এগুলো পছন্দ করতেন না। আমাদের নিজের চোখে দেখা,বহুবার বহু ছাত্রকে চরম পেটানির হাত থেকে রক্ষা করেছেন প্রকাশ স্যার। ছাত্রদেরকে যেন কম মার-ধোর করা হয় এজন্য তিনি অনেকবার হেড-স্যারের কাছে আবেদনও করেছেন, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। যাই হোক, স্যার যখন ক্লাসে ঢুকতেন সব ছাত্ররা হৈ-চৈ শুরু করে দিত। স্যারের আরেকটা গুন ছিল। স্যার সবার সাথে এমন ব্যাবহার করতেন যেন সবাই তার আপন ছেলে। যে যত দুষ্টামিই করুক না কেনো,স্যার তাকে মাফ করে দিতেন। শুধুমাত্র এই জিনিসটার কারনে ক্লাসের অনেক খারাপ ছেলেকে আমি নিজের চোখে ভালো হয়ে যেতে দেখেছি।

তবে সব ক্লাসেই এরকম কিছু ছাত্র থাকে যারা কখনই ভালো হয় না। তাদের দুষ্টামি কোন কিছুর বিনিময়ে কমে না। আমাদের ক্লাসেও এরকম দুজন ছিল। রকি আর সায়েম। সারা ক্লাসে গুণ্ডামি করে বেড়াতো বলে অনেকেই ওদের ভয় করতো। ওদের দুষ্টামির মাত্রা একদিন পৌঁছে গেলো চরম পর্যায়ে। সে ঘটনাই বলব-

৬ টা প্রিয়ড হবার কথা সেদিন। পঞ্চম প্রিয়ডে কোন স্যার আসছিলেন না। ক্লাসে তুমুল হৈ-চৈ। কেউ গল্প করছিলো,কেউ আপনমনে গলা ছেড়ে গান গাইছিলো,কেউ আবার তার সামনে বসা হাবা-গোবা ছেলেটার মাথায় ‘চটাস’ করে মেরে এমন ভাব করছিল যেন সে কিছুই জানে না। আমি চুপচাপ বসে সবকিছু দেখছিলাম। ক্লাস ক্যাপ্টেন চন্দন ক্লাস সামলাতে যেয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। তাকে একাই ক্লাস সামলাতে হচ্ছিলো কারন আমার পাশে বসা সেকেন্ড আর থার্ড ক্যাপ্টেন খাতায় কাটা-কাটি খেলায় ব্যাস্ত ছিল। এমন সময় হঠাৎ বাতাসের বেগে প্রকাশ স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। আমাদের হৈ-চৈ তখন আরো তুঙ্গে উঠলো। স্যার ক্লাসে ঢুকেই ব্ল্যাক-বোর্ডে কিছু একটা লিখতে শুরু করে দিলেন। এটা স্যারের পুরনো অভ্যাস। ক্লাসে দুইটা সারি ছিলো। বা- দিকের সারিতে সবসময় বসতো ভালো ছাত্রগুলো। আর যাবতীয় দুষ্ট প্রকৃতিরগুলো যেয়ে বসতো ডান দিকের সারিতে। সেই সারির প্রথম বেঞ্চেই বসেছিলো ক্লাসের সবচাইতে দুষ্ট দুই বন্ধু, সায়েম আর রকি। যাই হোক, স্যার তখন বোর্ড এ কিছু একটা লেখায় ব্যাস্ত। সেই মুহূর্তে সায়েমকে দেখলাম লেখা থামিয়ে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে স্যারের বসার চেয়ারটা ঠেলে খানিকটা দূরে সরিয়ে দিলো। সবাই তখন স্যারের প্রশ্নগুলো খাতায় ওঠাতে ব্যাস্ত। কেউ কিছু খেয়াল না করলেও আমার চোখে ব্যাপারটা ঠিকই ধরা পড়লো। তখনো আমি বুঝতে পারছিলাম না ব্যাপারটা কি ঘটতে যাচ্ছে। চেয়ারটা ঠেলে দিয়ে সায়েমও লেখায়ে মনোযোগ দিলো। এদিকে মিনিট-পাঁচেক পরে স্যার লেখা শেষ করে তার পুরনো অভ্যাসমত বোর্ডের দিকে মুখ করে চেয়ারে বসতে গেলেন।

আর তখনি………  ‘ধড়ামমম’_ _ _ _ _ _ _

সবাই স্তব্ধ হয়ে লেখা থামিয়ে দিলো।

দেখলাম,স্যার মাটিতে পরে আছেন। ছাত্ররা সবাই এর-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই এতোটাই ভ্যাবা-চ্যাকা খেয়ে গেলো যে, স্যারকে ধরে ওঠানোর কথাটাও ভুলে গেলো। আসলে ব্যাপারটা কেউই হজম করতে পারছিলো না। স্যার একমিনিট পর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। উঠে প্যান্টের ময়লা ঝাড়তে লাগলেন। মুখে স্ফীত একটা হাসি। স্যার তখন ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে বললেন, -এই কাজটা কে করলো একটু দাড়াও তো…

সবাই চুপ। কেউ দাঁড়ালো না। পুরো ক্লাসে পিন-পতন নিরবতা। এরকম বয়স্ক একজন মানুষকে এভাবে পরে যেতে দেখলে যে কারোরই খারাপ লাগবে। আর বিশেষ করে সে যদি হয় স্কুলের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্যার,সবার ‘বন্ধু-স্যার’……তাহলে ???

স্যার আবারো একই কথা বললেন কিন্তু কেউই দাঁড়ালো না। এরপর স্যার চোখের পানি লুকোনোর চেষ্টা করে বললেন, -দেখো বাবারা,তোমরা যে-ই কাজটা করেছো;দাড়িয়ে বলো। আমি কথা দিচ্ছি তাকে কিছুই বলবো না। তোমাদের কারো সাথেই কখনও আমি রুঢ় আচড়ন করিনি। করবোও না। আমি জানি, তোমরা অনেকেই আড়ালে আমাকে বন্ধু বলে ডাকো। তাতে আমি কিছু মনে করি না।আজকে তোমাদের এই বন্ধু এমন কি ক্ষতি করলো তোমাদের যে তোমরা এরকম একটা কাজ করতে পারলে ???

কারও মুখে কোন টুঁ শব্দ নেই। সবাই চুপ করে তাকিয়ে ছিলো স্যারের দিকে।

বেশকিছুক্ষন চুপ থাকার পর স্যার বোর্ডটা মুছে বেরিয়ে গেলেন। বেরুবার আগে জীবনে প্রথমবারের মত স্যারের চোখের কোনে দেখলাম পানি। মুহূর্তেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ক্লাস শেষ হতে তখনো প্রায় ২০ মিনিট বাকি। স্যার বের হবার সাথে সাথে আমি ঝাঁপিয়ে পরলাম সায়েমের উপর। আমার সাথে যোগ দিলো আরও কয়েকজন ছাত্র। ওরাও পিছন থেকে সায়েমের কুকীর্তি দেখেছে কিন্তু আমার মত ওরাও স্যারের কাছে বলার সাহস পায়নি। সায়েমের বন্ধু রকি সবাইকে সামলানোর চেষ্টা করছিলো কারন এটা নাকি ওরই বুদ্ধি ছিল। আমরা দমাদম কিল,ঘুষি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন চন্দন এসে ওদের দুজনকে দূরে সরিয়ে নিলো। ক্লাসে তখন তুমুল চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেছে। সবাই ওদের দুজনকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছিলো। দুজনকে দেখলাম অপরাধি ভঙ্গিতে ক্লাসের কোনায় দাড়িয়ে আছে।

প্রায় ১০ মিনিট পর চন্দন ওদের দুজনকে নিয়ে কোথায় যেন গেলো। উৎসুক কিছু ছাত্র পিছে পিছে যেতে চাইছিল কিন্তু সেকেন্ড ক্যাপ্টেন আটকে দিলো। বলল, যারা বাইরে যাবে তাদের রোল লিখে হেড-স্যারের কাছে দেয়া হবে। আর কি…? সবাই ক্লাসেই বসে রইলো। সেদিন শেষ ক্লাসটাও ভালমতো হল না,অথবা আমাদের কাছে ভালো লাগলো না। সবারই মন খুব খারাপ হয়ে রইলো। ছুটির পরে দেখলাম রকি আর সায়েম তখনো টিচার্স-রুমের বাইরে দাঁরিয়ে আছে। বাসায় চলে এলাম। পরে শুনেছিলাম ওরা নাকি স্যারের কাছে মাফ চাইতে গিয়েছিলো। স্যার মাফ করে দিয়েছিলেন।

এই ঘটনার প্রায় একবছর পর শুরু হলো আমাদের এস.এস.সি পরীক্ষা। সবার পরীক্ষাই খুব ভালো হলো। রেজাল্ট-এর দিনটার কথা আমার এখনও মনে আছে। সবাই স্কুলের মাঠে মিলিত হয়েছিলাম। আমরা সবাই মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করেছি আর আমাদের ব্যাচের রেজাল্টই নাকি আমাদের স্কুলের সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট ছিলো। সবাই মিলে সেদিন অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম স্কুলে। সে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। বাসায় আসার পথে রকি’কে দেখলাম। রিক্সায় করে কোথায় যেন যাচ্ছিলো। চোখ-মুখ ফোলা। মনে হচ্ছিলো,প্রচণ্ড কান্নার কারনে এমন হয়েছে। বাসায় গেঁটের কাছে আসতে আবার দেখা হলো সায়েমের সাথে। ওকে থামিয়ে রেজাল্ট-এর কথা জিজ্ঞেস করাতে অন্যদিকে তাকিয়ে গটগট করে হেঁটে চলে গেলো। ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। তবে এটা ভেবে খুব অবাক লাগছিলো যে, সায়েম আর রকি দুজনই খুব ভালো ছাত্র ছিলো। দুষ্টামি করলেও পড়াশুনায় ওরা দুজনই ছিলো খুব সিরিয়াস। ফেল করার কারনটা কি? কিছু বুঝতে পারলাম না। বাসায় ঢুকে গেলাম।

অনেকদিন পর এখন মাঝে মাঝে এই ব্যাপারটা নিয়ে যখন চিন্তা করি,বুঝতে পারি কি হতে পারে সেই কারন। কেনো ওরা এত ভালো ছাত্র হয়েও ফেল করলো। জানি,পাশ-ফেল ভাগ্যের ব্যাপার,কিন্তু ওদের ব্যাপারটা আমার কেনো জানি ভাগ্যের পরিহাস বলে মনে হচ্ছিলো না। এখানে হয়ত কাজ করেছে অন্যকিছু। সেদিন প্রকাশ স্যার ওদের মাফ করেছিলেন ঠিকই কিন্তু তার চোখের কোনে যে পানি আমি দেখেছিলাম হয়তো সেটারই চরম মূল্য ওদেরকে পরিশোধ করতে হলো। পৃথিবীতে তো অনেক ধরনের কষ্টই রয়েছে। প্রতিটা কষ্টকেই কোনো না কোনভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। নাম দেয়া যায়। তবে,স্যারের সেইদিনের সেই কষ্ট বা অনুভূতিটার কোনো নাম আমি আজও দিতে পারিনি। অনেক চেষ্টা করেছি। কোনোভাবেই পারিনি সেটাকে সংজ্ঞায়িত করতে। কি দেবো সেই কষ্টটার নাম? এরপর হাল ছেড়ে দিয়েছি। এই ভেবে যে,পৃথিবীতে কিছু কিছু আবেগ অনুভূতি রয়েছে;কষ্ট রয়েছে,যেগুলার আসলেই কোনো নাম নেই,নেই কোন সংজ্ঞা। যেগুলো শুধুমাত্র উপলব্ধি করা যায়।

যাই হোক,এরপর ওদের দুজনের সাথে মাঝেমধ্যেই দেখা হয়েছে। তবে পড়াশুনার ব্যাপারে কখনও কিছু জিজ্ঞেস করা হয়নি বা,জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করেনি। পরে অবশ্য শুনেছিলাম ওরা দুজনেই নাকি কাজে ঢুকে গেছে। পড়াশুনা ওদের আর করা হয়নি। থেমে গেছে ওখানেই।

                                                                                                                                                                                                                                                                                              (নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে লিখিত……)

ইউসুফ খান (মাকুমাযান)

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.